জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন
অন্যদের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম ৫৫% বেশি
ছবি: ফাইল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪১
ভারত থেকে ২ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে আদানি পাওয়ার সরবরাহ করে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে আসে বাকিটা। অসম ও অন্যায্য চুক্তির কারণে ভারতের অন্য সরবরাহকারীদের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম ৫৫ শতাংশ বেশি পড়ছে।
আওয়ামী লীগ আমলে বিশেষ আইনে সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলোর পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে। গতকাল রোববার বিদ্যুৎ ভবনে এ প্রতিবেদনের ওপর এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জাতীয় কমিটি।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে। হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের প্রোভিসি অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক চিফ অপারেটিং অফিসার আলী আশরাফ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান। ২০ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত ভালো তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল।
তিনি বলেন, চুক্তির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন সাত-আটজনের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ অনেক তথ্যপ্রমাণ দুর্নীতি দমন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। দুদক এরই মধ্যেই কাজ শুরু করেছে।
মোশতাক হোসেন আরও বলেন, সরকার অন্যান্য উৎস থেকে যে বিদ্যুৎ কিনেছে, একই সময়ে তার চেয়ে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দেওয়া হয়েছে। এমনকি ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সঙ্গে তুলনা করলেও এর দাম অনেক বেশি। আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল ৮.৬১ সেন্টে। শর্তের মারপ্যাঁচে ২০২৫ সালে পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪.৮৭ সেন্ট। এতে বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বেশি বিল দিতে হচ্ছে আদানিকে। চুক্তি অব্যাহত থাকলে ২৫ বছর ধরে দিয়ে যেতে হবে। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের আমলা বা রাজনীতিবিদের পক্ষে এমন চুক্তি করা সম্ভব নয়।
জাতীয় কমিটির প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম বলেন, বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। মামলার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় নেই, আমরা চাইব পরবর্তী সরকার যেন এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থবছর ২০১১ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের পরিশোধিত অর্থ ১১ গুণ বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। পিডিবি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে এবং ২০২৫ অর্থবছরে এর বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতায় উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সিস্টেমের ব্যবহার হার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ। সৌরবিদ্যুতের চুক্তি বাজারদরের চেয়ে ৭০-৮০ শতাংশ বেশি, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের খরচ ৪০-৫০ শতাংশ বেশি এবং বিনা টেন্ডারের গ্যাস প্রকল্পে বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে ৪৫ শতাংশ বেশি।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে বার্ষিক খরচ হচ্ছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে দেউলিয়ার পথে রয়েছে পিডিবি। ঘাটতি ঠেকাতে গেলে পাইকারি দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর ৮৬ শতাংশ দাম বাড়ালে ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। ওইসব দেশের শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বাংলাদেশের শিল্প।
আদানি বাড়তি বোঝা
প্রতিবেদনে বলা হয়, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি বাংলাদেশে বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ প্রায় চার থেকে পাঁচ টাকা বেশি পড়ছে। এর একটা অংশ কয়লার দাম বেশি, তবে বাকিটা মূলত চুক্তির একতরফা শর্ত, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ, কর-শুল্ক পাস থ্রু ও ঝুঁকি সরকারের ওপর চাপানোর কারণে। ‘টেক-অর-পে’ শর্ত থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলেও সরকার পুরো অর্থ দিতে বাধ্য, যা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
চুক্তিতে ডলারের সঙ্গে বিদ্যুতের দাম যুক্ত থাকার কারণে মুদ্রাস্ফীতি বা কয়লার দামের ওঠানামা সরাসরি সরকারের ওপর বোঝা হিসেবে এসেছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক ঘটনা ও আইনের পরিবর্তন হলে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আর্থিক দিক থেকে খুবই ক্ষতিকর। ভারতের কোনো দুর্ঘটনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হলে সে দায়ও বাংলাদেশকে বহন করতে হবে।
তবে আদানি গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, আমরা এখনও রিভিউ কমিটির প্রতিবেদন পাইনি। বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ কখনও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বা মতামত নিতে আসেনি। তাই প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
সামিট: একটি বিদ্যুৎ দানবের উত্থান
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় সামিট করপোরেশন বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সামিটের প্রকল্পগুলোতে কাঠামোগত অসামঞ্জস্য ও আর্থিক ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় ও বাজেট সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সামিটের চুক্তিতে অসম শর্তের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও ডিবিকে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। মেঘনাঘাট-২ প্রকল্পের ট্যারিফ কাঠামোতে বিশেষ অসংগতি দেখা যায়। গ্যাস সংকটে ডিজেলে চালানো হয়। কিন্তু জানা ছিল, গ্যাস পাওয়া যাবে না। গ্যাসের সময় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ প্রায় ৩ দশমিক ৬৯ ইউএস সেন্ট, যেখানে এইচএসডি তেলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৭৬ ইউএস সেন্ট, অর্থাৎ গ্যাসের চেয়ে ৪ দশমিক ২ গুণ বেশি খরচ। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডলারের বিনিময় হার ৮০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২০ টাকা হয়েছে, যার প্রভাব সামিটের ক্যাপাসিটি চার্জের ইউনিট খরচ ১ দশমিক ৫৮ টাকা থেকে ২ দশমিক ৩৭ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এইসব শর্ত দেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন করছে।
এসএস পাওয়ারের চুক্তিতে আর্থিক ও কাঠামোগত অসামঞ্জস্য
দেশের বিদ্যুৎ খাতে চরম আর্থিক চাপ ও ঝুঁকি তৈরি করেছে বাঁশখালীর আলোচিত এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার কয়লাভিত্তিক এক হাজার ২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সাময়িক ইনভয়েস অনুযায়ী, মাত্র এক মাসের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ছিল ৩৯২ কোটি টাকা (৩৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা বছরে প্রায় চার হাজার ৭১০ কোটি টাকা (৪২৮ মিলিয়ন ডলার) দাঁড়ায়। ২৫ বছরের চুক্তি মেয়াদে ক্যাপাসিটি চার্জের মোট মূল্য হতে পারে ১ দশমিক ১৭ ট্রিলিয়ন টাকা।
চুক্তির আরেকটি বড় অসংগতি হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যকর ইউনিট খরচ। ২০২৪ সালের জুনে ৪১৪ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মোট পেমেন্ট ছিল ৬৭৪ কোটি টাকা, যার ফলে প্রতি ইউনিট খরচ দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ২৬ টাকা। এটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের গড় ইউনিট খরচের দ্বিগুণেরও বেশি। এর পেছনে মূল কারণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং কয়লা পরিবহনের জন্য প্রয়োগকৃত ‘প্রক্সি ফর্মুলা’– যা চুক্তিতে উল্লেখ নেই। বরং বরিশাল প্রকল্পের ফ্রেইট হিসাব ব্যবহার করে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হয়েছে। এই ফর্মুলার ফলে স্পন্সররা কোটি কোটি
টাকা অতিরিক্ত মুনাফা পাচ্ছে চুক্তির ‘ট্রু-আপ’ মেকানিজম ও ‘পাস-থ্রু’ ক্লজের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মুদ্রাস্ফীতি এবং কর সংক্রান্ত ঝুঁকি বহন করতে বাধ্য করা হয়েছে। ২০১৭ সালে দুটি প্রকল্প একীভূত করে এক হাজার ২২৪ মেগাওয়াটে উন্নীত করার ফলে ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে এবং সরকারের দরকষাকষির ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়েছে। চুক্তির আওতায় পাওয়ার ফ্যাক্টর ০ দশমিক ৮৫ বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও গত জুনে গ্রিড সীমাবদ্ধতার অজুহাত দেখিয়ে এই মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এসএস পাওয়ার।
- বিষয় :
- বিদ্যুৎ আমদানি
