গণশুনানি
বেশি দামে ফার্নেস তেল বিক্রি করছে বিপিসি, লাভের পরও চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:২৭
প্রথমবারের মতো ফার্নেস অয়েল নিয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বেশি দামে তেল বিক্রি করায় উপস্থিত ভোক্তাদের তোপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসি লিটার প্রতি ফার্নেস অয়েলের দাম ৮১ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দাবি করেছে আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ টাকা ৮২ পয়সা হওয়া উচিত। এদিকে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি মনে করে ফার্নেস অয়েলের বর্তমান দাম ৮৬ টাকা থেকে কমিয়ে ৭৪ টাকা ০৪ পয়সা করা যায়। এদিকে লাভের পর তেল কোম্পানিগুলো বিতরণ মার্জিন (চার্জ) বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে।
উভয় পক্ষের মতামত শুনে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সব তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হবে। কাউকে বেশি কিংবা কম সুবিধা দেওয়া হবে না। সব বিবেচনা করেই আদেশ দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার বিইআরসি কনফারেন্স রুমে প্রথমবারের মতো ফার্নেস অয়েলের গণশুনানিতে এমন মতামত উঠে এসেছে। এসময় কমিশনের সদস্য মো. আব্দুর রাজ্জাক, মো. মিজানুর রহমান, সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহিদ সারওয়ার উপস্থিত ছিলেন।
গণশুনানিতে বিপিসি মহাব্যবস্থাপক এটিএম সেলিম বলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে যখন দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ৪৭৮ দশমিক ৪৫ ডলার, দামের সূচক ছিল কমতির দিকে। ডিসেম্বর মাসে ৩৪০ দশমিক ৯৪ ডলারে পাওয়া গেছে। তখন ৮৫ টাকা প্রস্তাব করলেও ডিউটি এবং অন্যান্য খরচসহ লিটার প্রতি ৮১ টাকা করার প্রস্তাব করেছি।
ফার্নেস অয়েলের প্রধান ক্রেতা পিডিবি তাদের উপস্থাপনায় বিপিসির তথ্য সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন। পিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, বিপিসির কাছে থেকে তেল কিনে আমদের বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছে। আর আমাদের কাছে তেল বিক্রি করে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি লাভ করেছে ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমাদের ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, আমরা ফার্নেস অয়েল বিপিসির কাছ থেকে কিনছি। আর বেসরকারি কোম্পানি নিজেরা আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি কোম্পানির আমদানিকৃত ফার্নেস অয়েলের দাম পড়েছে ৫৭ টাকা। আর বিপিসির কাছ থেকে কিনতে হয়েছে ৮৬ টাকা দরে।
আন্তর্জাতিক বাজারদরের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, কোন অবস্থাতেই ৫০ টাকার বেশি দাম হওয়া উচিত না। ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি খরচ হচ্ছে ১৮.৪১ টাকা। আর আমরা প্রতি ইউনিট বিক্রি করছি ৬.৯৯ টাকা (পাইকারি)। ভোক্তাদের কথা চিন্তা করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না।
আমরা (পিডিবি) বলছি আমার জনগণ, আমার ভোক্তাকে সাশ্রয়ী মূল্যে দিতে হবে। সেখানে বিপিসি ও তাদের অধীনস্থ কোম্পানিগুলো (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা) তাদের কোম্পানি, তাদের মুনাফা এভাবে উপস্থাপন করছে। পিডিবি চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে আগামী গরমের মৌসুম নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। ফার্নেস অয়েলের দাম কমানো না গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট হতে পারে। আমরা চাই আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী দর নির্ধারণ করা হোক।
পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, আমদানি করলে অনেক খরচ কম পড়ছে, বিপিসির কাছ থেকে কিনতে গেলে অনেক বেশি খরচ পড়ছে। ফার্নেস অয়েলের কারণেই বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাম সমন্বয় এবং জনগণকে স্বস্তি দেওয়া উচিত। তিনি বিপিসির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আমরা চাই না কোনো কোম্পানি অলাভজনক হোক। তবে নিজে মুনাফা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ঠিক হবে না।
বিপিসি দাবি করে, পিডিবির আন্তর্জাতিক বাজারদরের তথ্য সঠিক হলেও ডিউটিসহ অন্যান্য খরচ হয়তো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
বিপিসির দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি ফার্নেস অয়েল বিপণনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় কোম্পানি, পদ্মা অয়েল পিএলসি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, যমুনা অয়েল কোম্পানি এবং স্টান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি তাদের বিতরণ চার্জ ৫৫ পয়সা থেকে বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। কোম্পানিগুলোর দাবি ফার্নেস অয়েল বিক্রি করে তাদের লোকসান হচ্ছে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি বিতরণ মার্জিন ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১.২০ টাকা করার দাবি করেছে। বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটি বিতরণ মার্জিন ৮৫ পয়সা করার পক্ষে মতামত দিয়েছে।
জেরা পর্বে বিতরণ কোম্পানিগুলো স্বীকার করে নেয় তারা ধারাবাহিকভাবে মুনাফায় রয়েছে। গত অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের ১৮০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দিয়েছে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি তার স্টাফদের ১৫ লাখ টাকা করে প্রফিট বোনাস দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। মেঘনা অয়েল কোম্পানি ৬ লাখ টাকার মতো প্রফিট বোনাস পাওয়ার কথা জানায়। এতো মুনফার পরও কেনো বিতরণ মার্জিন বাড়ানোর দাবি এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, এগুলো আমাদের অপরিচালন খাত থেকে আয় হয়েছে! সেখান থেকে দেওয়া হচ্ছে।
শুনানিতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল এবং অকটেনের দাম বিপিসি কর্তৃক নির্ধারণের কঠোর সমালোচনা করেন এক ভোক্তা। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী সকল জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির। তারা কেনো শুধু ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করবে। এখানে সব ধরনের জ্বালানির দাম বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। গণশুনানির বিষয়ে কারো কোন মতামত থাকলে লিখিত আকারে জমা দেওয়া জন্য ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন বিইআরসি চেয়ারম্যান।
- বিষয় :
- ফার্নেস অয়েল
- দাম
- শুনানি
