নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মব নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকার মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
টিআইবি কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেটি অন্য সবকিছুর মতো নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও দায় আছে। সরকার শুরু থেকে মব সহিংসতা প্রতিরোধে তৎপরতা দেখাতে পারেনি।
মবের উৎপত্তি নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাংলাদেশে মব সহিংসতা শুরু হয়েছে সরকারের ভেতর থেকে। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে প্রথম মবের উৎপত্তি হয়েছিল। সরকারের বাইরের শক্তি যারা এখন মব করছে, তারা ক্ষমতায়িত হয়েছে সচিবালয়ে মব সৃষ্টির পরে। এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।
প্রতিবেদনে গণমাধ্যমের বিষয়ে বলা হয়েছে, রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারের (আরএসএফ) ২০২৫-এর প্রতিবেদনে প্রেস ফ্রিডম সূচকে বাংলাদেশ ১৬ ধাপ উন্নতি করলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন স্বাধীন গণমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায় হিসেবে ১৩টি আইনের বিভিন্ন ধারা চিহ্নিত করলেও সংস্কারের জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের খসড়া প্রস্তুত করে দিলেও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই তা বাদ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়ন করা হলেও তা দেশে মুক্তগণমাধ্যম বিকাশে জনপ্রত্যাশার প্রতি পরিহাসস্বরূপ।
তথ্য মন্ত্রণালয় শুরুতে কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে উপদেষ্টাদের নিয়ে কমিটি গঠন করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। গণমাধ্যম নিবন্ধন দেওয়ার প্রক্রিয়া কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের মতোই বিদ্যমান। ২০২৫ সালে একটি নতুন রাজনৈতিক দল/প্ল্যাটফর্মের দুইজন নেতাকে একাধিক টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদান করার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ঘাটতি হয়েছে। প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন তালিকা সংশোধন নিয়ে সরকারের বিতর্কিত কার্যক্রম দেখা গিয়েছে। তিন দফায় ১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল, সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাংবাদিকদের প্রবেশ সীমাবদ্ধ করা, প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন নীতিমালা ২০২২ সংশোধন করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব তৈরির চেষ্টা না থাকলেও ‘মব’ সহিংসতার মাধ্যমে গণমাধ্যম কার্যালয়গুলোতে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। সাংবাদিক, লেখক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ছয়জন সাংবাদিক দায়িত্ব পালনকালে হামলায় নিহত হয়েছেন। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে নজিরবিহীনভাবে মব সৃষ্টি করে হামলা-লুটপাট-ভাঙচুর-অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে সরকারের নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর ভূমিকা দেখা গিয়েছে।
২০২৪-এর আগস্ট থেকে ২০২৫-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৯৭টি হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ১ হাজার ১০৪ জন গণমাধ্যমকর্মী হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০৪ জনকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় ৩০ জন গ্রেপ্তার ও জামিন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। আটটি সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং ১১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তাপ্রধানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অন্তত ১৮৯ জন সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন।
২৯টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল এবং একটি অনলাইন পোর্টালের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অপব্যবহারের প্রবণতা দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ দল, সরকারের বিরুদ্ধে গুজব/মিথ্যা তথ্য প্রচার চালানো হয়েছে, বিরোধী মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া গণমাধ্যমের ফটোকার্ড ও লোগো ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘাটতি দেখা গিয়েছে।
টিআইবি বলেছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দৃশ্যমান ব্যর্থতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা এখন রাষ্ট্রের পাশাপাশি অতিক্ষমতায়িত অরাষ্ট্রীয় শক্তির হাতে জিম্মি। অন্যদিকে গণমাধ্যমের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ শত্রুর অস্তিত্ব বিদ্যমান।
- বিষয় :
- মব
