ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক চুক্তির অঙ্গীকার বিএনপির

উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি

নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক চুক্তির অঙ্গীকার বিএনপির
×

রাজধানীতে গতকাল নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মিডিয়া সেল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫৬ | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৭:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। ৫১ দফার ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করাসহ ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান’-এর আলোকে মানবিক, অন্তর্ভুক্তি ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তির ঘোষণা। 

গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহার ঘোষণা করেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। সেগুলো হলো– দুর্নীতি, আইনের শাসন ও জবাবদিহি।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে বিএনপি। এতে পাঁচটি ভাগে ৫১ দফা ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে দলটি।

প্রধান প্রতিশ্রুতি

ইশতেহারে বিএনপির ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে আছে– প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে। 

কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশু পালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন। 

দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। 

আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে। 

তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। 

ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। 

পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।

ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। 

ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে। এই ৯টি অগ্রাধিকার বিষয়ে বলা হয়েছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। তারেক রহমান বলেন, বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা– এই নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। 

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, সেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষ্যমের অবসান হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে– সবার আগে বাংলাদেশ।

মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের অঙ্গীকার

তারেক রহমান রহমান বলেন, বিএনপির রাজনীতি স্লোগান-নির্ভর নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক। এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাপক সামাজিক পরিকল্পনা মানুষের কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, সুষম উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আইনের শাসন এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। 

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার

দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে অঙ্গীকার করে তারেক রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি জবাবদিহিমূলক, দায়বদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। ৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন: জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ যেসব বিষয়ে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে সেগুলো সেভাবে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে আর কখনোই ফ্যাসিবাদ কায়েম ও গণতন্ত্র হত্যা করতে দেওয়া হবে না। বাংলাদেশকে কারোরই তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে দেওয়া হবে না। বৈষম্য দূরীকরণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সুনীতি, সুশাসন ও সু-সরকারের সমন্বয়ের মাধ্যমে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা পুনঃস্থাপন করা হবে

তারেক রহমান বলেন, জিয়াউর রহমান সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস– এই কথাটি সংযোজন করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত স্বৈরাচারের সময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস– এই কথাটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস– এই কথাটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে আমরা সংবিধানে পুনঃস্থাপন করতে চাই।

উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃজন

ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি ‘নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি। 

একজন উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃজন করা হবে এবং তিনি রাষ্ট্রপতির মতোই নির্বাচিত হবেন। একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যতবারই হোক, তিনি সর্বোচ্চ ১০ বছর অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদেও অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন করা হবে।

নিম্নকক্ষের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধি

সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও অন্য পেশাজীবীদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে। রাজনৈতিক দলসমূহ নিম্নকক্ষের অর্জিত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে। আইনসভার উভয় কক্ষে দুজন ডেপুটি স্পিকারের মধ্য থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার সরকারদলীয় ব্যতীত অন্য সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত করা হবে।

পিএসসি, দুদক গঠনে আইন প্রণয়ন

ইশতেহারে বলা হয়েছে সরকারি কর্মকমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের জন্য এবং মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাধারণ (অন্য সব সেক্টরে) নিয়োগের জন্য যথোপযুক্ত শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তর করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা আইনানুসারে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন।

ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠন

বিএনপির ৩১ দফায় ঘোষিত ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’-এর আলোকে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোর সত্য উদ্ঘাটন করা হবে। যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের অর্থবহ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে।

পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন– সবার আগে বাংলাদেশ

বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন– ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বিএনপি বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই। পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ প্রাধান্য পাবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণ করবে। বিএনপি সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তবধর্মী, পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতিভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেবে। বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না।

ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনায় পরিকল্পনার কথা সবিস্তারে তুলে ধরে ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। এতে গণতন্ত্র; মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান; সাংবিধানিক সংস্কার, জাতি গঠন; সুশাসন (দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ); স্থানীয় সরকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। সেখানে দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষক, কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান, যুব উন্নয়ন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শ্রম ও শ্রমিক কল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী, সামাজিক ব্যাধির সমস্যা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, পানিসম্পদ পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পররাষ্ট্রনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারের তৃতীয় ভাগে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বিএনপি। এতে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন– ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ, বেসরকারি খাত উন্নয়ন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত সংস্কার, পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, শিল্প খাত, কারু ও হস্তশিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, সেবা খাত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও পরিবহন খাত, সুনীল অর্থনীতি, সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়ন, রাজস্ব আয় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

ইশতেহারের চতুর্থ ভাগে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। এতে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী প্রতিষ্ঠা, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন, হাওর-বাঁওড় অঞ্চলের উন্নয়ন, উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, নগরায়ণ ও আবাসন, পর্যটন খাত এবং নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা বিনির্মাণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে দলটি।

পঞ্চম অধ্যায়ে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। এতে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পাহাড় ও সমতলের নৃগোষ্ঠী, ক্রীড়া, গণমাধ্যম, শিল্প ও সংস্কৃতি, নৈতিকতার শক্তি পুনরুদ্ধারের পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।

প্রায় দুই ঘণ্টার বক্তৃতার শেষ দিকে আবারও দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়ে কথা বলেন তারেক রহমান।  তিনি বলেন, ‘আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আমার দলের পক্ষ হয়ে আমি আপনাদের এতটুকু বলতে চাই যে, আমার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আগামী ১২ তারিখে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে, আমাদের সর্বাধিক আর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে এই তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা– দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং জবাবদিহি। যে কোনো মূল্যে আমরা এগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেব।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভীর পরিচালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, জাগপার খন্দকার লুৎফুর রহমান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্‌, অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, অধ্যাপক ড. সোহাগ আউয়াল, অধ্যাপক আবুল কালাম সরকার, অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম, অধ্যাপক মহিউদ্দিন। 

যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, কালবেলা সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, মানবকণ্ঠ সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম, জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক খুরশিদ আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার নাগরিক এ সময় উপস্থিত ছিলেন। 

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, ব্রিটেন, চীন, পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) ৩৮টি দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। 

আরও পড়ুন

×