‘যতক্ষণ শ্বাস আছে, আমি বিচারের দাবি ছাড়ব না’
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘আশা করেছিলাম, এই (অন্তর্বর্তী) সরকারের সময়ে তদন্তে সত্যিটা উঠে আসবে। জানতে পারব– কারা কেন আমার ছেলে আর বউমাকে মেরেছে। এখন হতাশ। আদৌ কোনোদিন বিচার পাব কিনা, জানি না। তবে যতক্ষণ শ্বাস আছে, আমি বিচারের দাবি ছাড়ব না।’ এভাবেই নিজের হতাশার কথা বলছিলেন নির্মম হত্যার শিকার সাংবাদিক সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি ‘সত্যি’টা জানার জন্য অপেক্ষা করছেন। শুধু তিনিই নন; সাগর-রুনি হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি নিয়ে স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতীক্ষাও যেন অন্তহীন।
স্বজনরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর তারা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে যা হয়নি, এখন তা নিশ্চয়ই হবে। জানা যাবে সাংবাদিক দম্পতি খুনের কারণ; শনাক্ত হবে জড়িতরা। তাদের আশা আরও জোরালো হয়, যখন মামলাটির তদন্তে ছয় মাসের সময় বেঁধে দিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এ মামলা নিয়ে ‘প্রহসন হয়েছে’ উল্লেখ করে বিচারের আশ্বাস দেন সরকারের দায়িত্বশীলরা। তবে রহস্যের জট এখনও খোলেনি।
টাস্কফোর্সের সদস্য ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান সমকালকে বলেন, আমরা সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে আন্তরিকভাবে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। অনেকের সাক্ষ্য ও বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। যাচাই করা হয়েছে অনেক বিষয়। তবে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এদিকে আদালতে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ এ পর্যন্ত ১২৪ বার পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল সোমবার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। প্রতিবেদন না দেওয়ায় আদালত নতুন তারিখ ধার্য করেছেন ১ এপ্রিল। সেদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ফ্ল্যাট থেকে সাগর-রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সাগর ছিলেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক, আর মেহেরুন রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যার পর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। একাধিক সংস্থা মামলাটি তদন্ত করেছে। এখন নতুন করে কিছু পাওয়ার সুযোগ কম। তারপরও আগে যাদের সন্দেহ করা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদেরসহ নতুন অনেককে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মশিউর রহমান, সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, মনজুরুল আহসান বুলবুল, এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান, তাঁর ভাই মাকসুদুর রহমান, সাংবাদিক জ ই মামুন এবং সাগর-রুনির সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য নেওয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক দাবির বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া হয়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য-প্রমাণ এখনও মেলেনি। শেষ পর্যন্ত প্রমাণ না করতে পারলে এ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হতে পারে।
মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বলেন, টাস্কফোর্সও আমাদের কোনো আশার কথা শোনাতে পারেনি। শুধু কিছু গুজবের বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া গেছে। এ ঘটনায় হয়তো প্রশিক্ষিত কোনো বাহিনী জড়িত। তাদের বিচার করা হয়তো কঠিন হবে। তবে হত্যার কারণটা অন্তত জানতে পারব বলে আশা করেছিলাম। সেটিও জানা গেল না। সত্যি বলতে, এই সরকারের সময়ই হলো না; এখন আর কিছু আশাও করতে পারছি না।
এর আগে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, যারা এই মামলার ব্যাপারে তথ্য দিতে পারবেন বলে মনে হয়েছে বা বিভিন্ন সময়ে যাদের নাম অনেকে বলেছেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কেউ বলছেন, তিনি আরেকজনের কাছে শুনেছিলেন; কেউ বলছেন, ইউটিউবে দেখেছিলেন।
তদন্তের গতিপথ
চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে পিবিআই-প্রধানকে আহ্বায়ক করা হয়। গত বছরের ৪ এপ্রিল তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। পরে আবারও তদন্তের সময় বাড়ানো হয়।
এর আগে ২০১২ সালে সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় মামলা হয় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায়। চার দিনের মাথায় তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিবি। ৬২ দিন পর সংস্থাটি তদন্তে ব্যর্থতা স্বীকার করলে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল মামলাটি র্যাবে স্থানান্তর করা হয়। ওই বছরের ২৬ এপ্রিল পুনঃময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে তোলা হয় দুজনের লাশ। তখন ভিসেরা আলামতসহ আরও কিছু নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই র্যাব বনানী থানার একটি হত্যা ও ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার মিন্টু, বকুল মিয়া, কামরুল হাসান অরুণ, রফিকুল ইসলাম ও আবু সাঈদকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। এ ছাড়া ওই মামলায় বিভিন্ন সময়ে রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান, বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল ও নিরাপত্তাকর্মী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবিরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
- বিষয় :
- সাগর-রুনি হত্যা
