বিশেষ লেখা
প্রশাসন ও রাষ্ট্রপক্ষকে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা দেখাতে হবে
হোসেন জিল্লুর রহমান
হোসেন জিল্লুর রহমান
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমার প্রথম প্রত্যাশা হচ্ছে– এটি যেন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হয়। নির্বাচন হবে কিনা– তা নিয়ে শঙ্কা এবং সন্দেহ ছিল। এগুলো পেরিয়ে আমরা নির্বাচনের একদম দ্বারপ্রান্তে। এখনকার মূল চাওয়া– ভোটাররা বিশেষত সংখ্যালঘু, নারী এবং দরিদ্র শ্রেণির মানুষ যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন।
আরেকটা প্রত্যাশা হচ্ছে, রাজনৈতিক দল এবং দলীয় কর্মীরা সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখাবেন। যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত না হয়। নির্বাচন যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হতে পারে। কোনো ধরনের অঘটন যাতে না ঘটাতে পারে। এদিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রপক্ষকে তাদের পদক্ষেপের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা দেখাতে হবে। অভিযোগ উঠলে খুব দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করতে হবে। সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। শুধু অজুহাত দিয়ে কোনো দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করতে হবে, মানুষ নির্ভয়ে যাতে সুষ্ঠুভাবে ভোটটা দিতে পারে। নারীদের একটা শঙ্কা থাকে। যারা সংখ্যালঘু অথবা যারা দরিদ্র, তাদের মনে প্রশ্ন থাকে– প্রশাসন নিরপেক্ষ কিনা। তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দেবে কিনা– এই ভয়ে থাকে। এগুলো আমরা যাতে অতিক্রম করতে পারি।
বিগত তিনটি নির্বাচনে মানুষ স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে পারেনি। ভোটের অধিকার ছিল না। রাতের ভোট নামে অভিহিত হয়েছে। মনে হতো, বুথের মধ্যে ভূত বসে আছে। এসব বিষয় ভোটকে একদম কলুষিত করে ফেলেছিল। আমার বিশ্বাস, এবারের নির্বাচনে স্বাধীন এবং নির্ভয়ে মানুষ ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। আশা করব, সব পক্ষ অর্থাৎ ভোটার, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রপক্ষ এবং নির্বাচনী প্রশাসন এই নির্বাচনকে আলাদা বৈশিষ্ট্যময় করে তুলবে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তিন ধরনের সহনশীলতা আমাদের দেখাতে হবে। একটি হলো, ভোটারদের নিজেদের সহনশীলতা। অন্য দলকে ভোট দিয়েছে মনে করে কারও বিষয়ে অসহিষ্ণু হওয়া যাবে না। ভোটারদের মধ্যেই সহনশীলতা দরকার। দলীয় কর্মীদের মধ্যে একই বিষয়ে সহনশীলতা অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয়ত, ফলাফল মেনে নেওয়ার সহনশীলতা।
রাষ্ট্র এবং প্রশাসন, বিশেষ করে নির্বাচনী প্রশাসনের নিরপেক্ষতা খুবই জরুরি। গত তিনটি নির্বাচনে তারা নিরপেক্ষ ছিল না। এ ছাড়া অনেক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক কলুষিত সংস্কৃতি তৈরি করেছিলেন। তারা সরকারের মতো কথা বলেছিলেন। এবারও পর্যবেক্ষক থাকবেন অনেক। পেশাদারিত্ব বজায় রাখা তাদের গুরুদায়িত্ব। শুধু পর্যবেক্ষকের সাইনবোর্ড গলায় দিয়ে ঘুরে বেড়ালে চলবে না। নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষ থেকে নিরপেক্ষতার বিষয়টা আমরা খুব জোরালোভাবে আশা করি। রাষ্ট্রপক্ষ বলতে অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচনী প্রশাসন। নির্বাচনী প্রশাসন শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনও।
আমাদের মাথায় রাখতে হবে, নির্বাচন হলো আমাদের নানা সমস্যার সমাধানের পথে একটা পদক্ষেপ। নির্বাচন আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে– এমন চিন্তা করা বাস্তবসম্মত নয়। এই নির্বাচন অনেকটা তারুণ্যনির্ভর। তরুণরা কিন্তু চিন্তা করছে, তার সিলটা একটা সমাধানের পথে নিয়ে যাবে।
যারা নির্বাচিত হবেন, তারা সরকারি এবং বিরোধী পক্ষ হবেন। দুপক্ষেরই গুরুদায়িত্ব থাকবে। নির্বাচনের পর সরকার গঠন দ্বিতীয় পদক্ষেপ। সরকার এবং বিরোধী দল মিলে কার্যকর সংসদ তৈরি করা হচ্ছে তৃতীয় পদক্ষেপ। তার পরের পদক্ষেপ হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রচেষ্টা।
কেউ যদি বলে, আমি ম্যাজিক নিয়ে আসছি, তা অবশ্যই কাম্য নয়। কারণ, ম্যাজিক কারও হাতে নেই। সবারই সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে। অবশ্যই এখানে নেতৃত্বের একটা বড় বিষয় আছে। নেতৃত্ব মানে নিজের মাথা থেকে সব বের হওয়া নয়। নেতৃত্ব মানে সমাজের মধ্যে সমাধানমুখী উদ্ভাবনী শক্তিগুলো একত্রিত করতে পারা এবং একটা গতি তৈরি করা। শুধু পদক্ষেপ নয়, আমরা সমাধান ও ফলাফল দেখতে চাই।
আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির মধ্যে আরেকটা বড় সমস্যা আছে। সরকার বলি, আমলাতন্ত্র বলি, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও পদক্ষেপ নিয়েই বেশি কথা বলে। কিন্তু মানুষ তো ফলাফল চায়। আপনি পদক্ষেপ নিয়েছেন খুব ভালো কথা। এর ফলাফল কী আসছে, আমরা দেখতে চাই। আশা করব, তারা এক ধরনের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ফলাফলের জায়গায় যেন খুব বেশি করে নজর দেন।
ফলাফলের আলোচনায় সংস্কারের বিষয়টা চলে আসে। ‘সংস্কার’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সবচেয়ে ব্যবহৃত শব্দ। যদিও সংস্কারের প্রকৃত ফলাফলের ঝুড়িটা খুব বেশি নয়। কিন্তু আলোচনা হয়েছে অনেক। অনেক কমিশন হয়েছে। আমি বলব যে, সংস্কারের অনেক দিক আছে। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিষয় আছে। সমস্যা সঠিকভাবে অনুধাবন হয়েছে কিনা, তাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কয়েকটা সংস্কারের জায়গা এক অর্থে আলোচনার মধ্যে আসেনি। যেমন– স্থানীয় সরকার, শিক্ষা এমনকি অর্থনীতির সংস্কারের বিষয়টাও বড় করে আসেনি সেভাবে। কিছু খণ্ডিত পদক্ষেপ হয়েছে।
আমি মনে করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলোর একটা সুষ্ঠু মূল্যায়ন নির্বাচিত সরকারের করা উচতি। এটি দোষ-গুণ ধরিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। জাতির অগ্রযাত্রায় এটি শিক্ষণ প্রক্রিয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালের একটা সুষ্ঠু মূল্যায়ন শুধু এক জায়গা থেকে নয়– সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিসরে হওয়া দরকার।
এবার ইশতেহার প্রসঙ্গে আসি। ইশতেহার ঘোষণা করেছে প্রত্যেক দল। সেগুলোর মূল্যায়ন দরকার হবে। তারা নিজেরাই হয়তো মূল্যায়ন করবেন। হয়তো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনেক প্রস্তাব করেছেন। সরকারে বসলে তখন আবার তাদের বসা দরকার। তখন বাস্তবতাটা বুঝতে পারবেন। আর্থিক সক্ষমতা কতটুকু আছে বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোন জায়গায় রেখে গেল– এগুলো তাদের বুঝতে হবে। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে এসে অনেক চুক্তি হলো। একটা প্রশ্ন আসবে– নির্বাচিত সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার স্বাধীন সীমানাগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে কিনা?
আরেকটা কথা বলা জরুরি। ফলাফল আমরা চাই। আমরা সমাধান চাই। কিন্তু এর আগের ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসন, বিশেষ করে ২০১৪ থেকে যে এক দশক চরম কর্তৃত্ববাদী শাসন আমরা দেখেছি, সেখানে কিন্তু তারা ফলাফল নিয়ে কথাবার্তা বলতেন। কিন্তু তাদের কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। ভয়ের সংস্কৃতিটা একেবারে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে গেছে। দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলোর পরিবর্তন খুব জরুরি।
আমি আশা করব, রাষ্ট্রের প্রতিটা অঙ্গ যেন সচল থাকে। আমাদের এখানে আমলাতন্ত্র অতি ক্ষমতাবান থাকে। আমাদের প্রত্যাশা– সংসদ যাতে জনস্বার্থগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমাদের বিচার বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটা অঙ্গ যেন তার স্ব-স্ব বলয়ে সার্বিক একটা সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরির দায়িত্ব পালন করতে পারে।
যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসবেন, তাদের ওপর আমাদের ভরসা রাখতে হবে প্রথমে। কারণ তারা তো একটা দায়িত্ব নিয়ে আসছেন, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আসছেন। কিন্তু তারা যেন জনগণের কথা ভুলে না যান এবং ক্ষমতাকেই সর্বোচ্চ বিষয় হিসেবে ভাবতে শুরু না করেন। তাদের জনতার ভেতরের শক্তির প্রতি সম্মান রাখতে হবে, যা ২৪-এর জুলাই-আগস্টে উচ্চারিত হয়েছিল।
যারাই আসবেন নিজেদের বিজয়ী হিসেবে চিন্তা না করাই ভালো। তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে ভাবতে হবে। এই জায়গায় মানসিক পরিবর্তন দরকার। জাতীয় ঐক্যকে সংহত করার প্রচেষ্টা যেন সবসময় থাকে। সামাজিক গোষ্ঠী বলি, কোনো এলাকার গোষ্ঠী বলি, কোনো বয়সগত গোষ্ঠীর কথা বলি– সবাই যেন মনে করতে পারে, এই পরিবর্তনের যাত্রায় আমিও একজন সহযাত্রী। এই অনুভবটা যেন সবার মধ্যে আমরা জাগ্রত করতে পারি। যারা আসছেন তাদের এখানে একটা বড় দায়িত্ব থাকবে।
আমি মনে করি, মানুষের সম্মিলিত শক্তি আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমরা একত্রিত হতে পারলে বহু কিছু করে ফেলতে পারি এবং অনেক দেশ সেটিই দেখিয়েছে। আমাদের অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে– চাটুকারিতার সংস্কৃতি গভীরভাবে ঢুকে আছে। যারা বিজয়ী হবেন তাদের আমি অনুরোধ করব– চাটুকারিতার সংস্কৃতি থেকে নিজেদের সজ্ঞানে মুক্ত রাখতে হবে।
বাংলাদেশের একটা চরিত্র হচ্ছে, সাধারণ মানুষ বুঝেছে– আমার জীবনের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে আমার নিজের। এই ধরনের একটা ভাবনা থেকে বাংলাদেশের পরিবর্তন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে। এখানে রাষ্ট্র, সরকার ইত্যাদির অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে পাশে থাকতে পারা। তবে অনেক সময় আমাদের চাহিদাগুলো রাজনীতিবিদদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। দেখা যায়, সাধারণ মানুষ ছোট ছোট দল হয়ে একটা অনৈতিক দাবি করে বসল, যা অন্যদের জন্য খারাপ হলো। গোষ্ঠীগত দাবি এবং গোষ্ঠীগত চাপ তৈরি না করে আমাদের বৃহত্তর চিন্তার মধ্যে থাকা দরকার। ওই খানেই কিন্তু আমরা একটা সুষ্ঠু অগ্রগতি অর্জন করতে পারি।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি
- বিষয় :
- হোসেন জিল্লুর রহমান
