অভিমত
নির্বাচিত নতুন সরকার যেন নারীবান্ধব হয়
খুশী কবির
খুশী কবির
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:১২ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমি ধন্যবাদ জানাতে চাচ্ছি– নির্বিঘ্নে, সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয়েছে। ফলাফলও ইতোমধ্যে চলে এসেছে। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। বিএনপিকে প্রথমে মনে রাখতে হবে– সবাই তাদের ভোট দেয়নি, কিন্তু সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে।
অনেকেই ভোট দিতে গেছে। ভোটারদের বেশির ভাগই কোনো ধর্মভিত্তিক দলকে সরকার গঠন করতে দিতে চায়নি। ’৭১-এ দেশের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছিল; যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মানে ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ নারী ধর্ষণে জড়িত ছিল, তারা যেন বাংলাদেশে সরকার গঠন করতে না পারে– এটার বড় একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখতে পেয়েছি নির্বাচনে। আমরা জানি, জামায়াতে ইসলামী তাদের পুরো জীবনে এত ভোট কোনো দিন পায়নি। এত আসন কোনো দিন পায়নি। এর অন্যতম কারণ, মাঠে পরিচিত দলগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি ছিল।
আমাদের দেশে যারা সবচেয়ে বেশি প্রান্তে আছে, তাদের বিচ্ছিন্ন করে প্রান্তে রাখা হয় এবং মূলধারায় আনা হয় না। নারীদের মূলধারায় নিয়ে আসার পরিবর্তে পিছিয়ে রাখতে চেষ্টা থাকে। যারা জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু, তাদের হয়রানি করা হয়। আশা রাখি, বিএনপি সরকার গঠন করে এগুলো নিরসনে পদক্ষেপ নেবে। আর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা দেশ পরিচালনায় ধর্মভিত্তিক অবস্থান যেন না হয়। দেশ যেন সবার জন্য হয়। স্বাধীনতার চার মূলনীতি যেন সামনে রাখা হয়। মর্যাদা ও অবস্থান যেন সমান থাকে। আমরা আশা রাখব, সব ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নারীদের সামনে নিয়ে আসা এবং নারীদের সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যেন বাস্তবায়ন হয়। এই আহ্বান রাখছি– নির্বাচিত সরকার যেন নারীবান্ধব হয়। সব মানুষ, সব জনগণের এবং সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা যেন খেয়াল রাখে।
যারা বিরোধী দল হিসেবে আসছে তারা যদি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বক্তব্য রাখতে পারত, তাহলে ভালো হতো। কিন্তু সেখানে ঘাটতি থাকবে। স্বতন্ত্র সংখ্যা বেশি এলে ভালো হতো। যারা এসেছে তারা বিএনপি থেকেই এসেছে। যাই হোক, নাগরিক সমাজের বক্তব্য শোনার মানসিকতা যেন সরকারের থাকে।
গণতন্ত্র হচ্ছে জবাবদিহি। আন সেই জবাবদিহি হলো জনগণের কাছে। ভোট দিয়ে জনগণের দায়িত্ব শেষ হলো– তা নয়। জনগণের কাছে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। যারা পার্লামেন্টের বাইরে থাকবে, তাদেরও কথা বলার সুযোগ বা কোনো জায়গা বা তাদের মন্তব্য, তাদের বক্তব্য এবং তাদের মতামত নেওয়ার কোনো পদ্ধতি বের করার পরিকল্পনাগুলো নতুন সরকার নিতে পারে। তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ যেন আমাদের সবার সঙ্গে সম্পর্কিত করে নেওয়া হয়। শুধু শহরকেন্দ্রিক আলোচনা না করে গ্রামে, বিশেষ করে আদিবাসী, ভূমিহীন, ক্ষেতমজুর, নারীদের আমলে নিতে হবে।
আমরা আশা করছি, নতুন সরকার মানবাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার থাকবে। সর্বক্ষেত্রে নারীদের অধিকার এবং সুরক্ষার আন্তর্জাতিক সনদগুলো যেন বাস্তবায়ন হয়। আমরা সবাই বাংলাদেশকে একটি সুন্দর জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। একটি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটে সরকার গঠন করা হচ্ছে। সরকারের কাছে মানুষের অনেক বেশি আকাঙ্ক্ষা। আমরা অনেক কিছু প্রত্যাশা করছি।
আমরা এখন যে সরকার পাচ্ছি, তার প্রেক্ষাপটে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তি তরুণ। তারা আমাদের জনসংখ্যার বিশাল অংশ। তরুণদের মতামত, চিন্তা ও অবস্থান আমলে নিতে হবে। এর মানে এই নয়, অভিজ্ঞদের আমরা মূল্য দেব না। সবটা মিলিয়ে চিন্তা করতে হবে।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে বলব, এটি বেশ জটিল। অনেক বিষয় সহজ করতে হবে। মানুষের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। তবে কয়েকটা জিনিস খুবই জরুরি। ক্ষমতা যেন কুক্ষিগত না হয়। ক্ষমতা যেন স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যেতে না পারে।
আমরা দেখেছি, গণভোটে অধিকাংশ মত ‘হ্যাঁ’ এসেছে। কিন্তু এই গণভোটের পেছনে থাকা জুলাই সনদে যে বিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে থাকা বেশ কিছু বিষয় সুস্পষ্ট ও সহজ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সনদে উল্লিখিত সব বিষয়ই যে সঠিক, তা নয়। সবটাতে সবাই একমত পোষণ করবে– সেটিও নয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে কীভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। পাশাপাশি স্বৈরতন্ত্র দূর করার ব্যাপার নিশ্চিত করতে নির্বাচিত সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আমার মনে হয়, দেশের নাগরিকরা নতুন সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত থাকবে। আমি আহ্বান করছি, সব সচেতন নাগরিক যেন মতামত দেন এবং সরকার যেন সবার মতামত নেয়।
লেখক: ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী ও মানবাধিকারকর্মী
