মনির হত্যার নেপথ্যে কারা, জানা গেল না ১৫ বছরেও
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২২ | আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাড়ে ১৫ বছর আগে সৌদি আরব যাওয়ার উদ্দেশে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে নিখোঁজ হন প্রবাসী ব্যবসায়ী মনির হোসেন। দীর্ঘ তদন্তের একপর্যায়ে জানা যায়, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। নিখোঁজের এক দিন পর গাজীপুরের পুবাইল ফেরিঘাট এলাকায় উদ্ধার ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ লাশটিই ছিল তাঁর। তবে এখনও পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি কে বা কারা কেন তাঁকে হত্যা করেছে। এ মামলায় অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে নিহতের স্বজন বলছেন, তদন্ত সঠিকভাবে এগোচ্ছে না।
মনিরের মামাতো ভাই আবু বকর সিদ্দিক সমকালকে বলেন, দুই বছর আগে পিবিআইয়ের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তখন আদালত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশনা দেন। এরপর গত বছর আমির হোসেন মিন্টু ওরফে কেট্টে মিন্টু ও আনোয়ারা আক্তার লিপিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিছুদিন কারাগারে থাকার পর জালিয়াতির মাধ্যমে জামিন নেন তারা। নিম্ন আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলেও সেই তথ্য তারা উচ্চ আদালতে গোপন করেন। বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে তাদের জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। এরপর প্রায় ছয় মাস ধরে তারা পলাতক।
ঘটনা সম্পর্কে তিনি জানান, ২০১০ সালের ১০ জুন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে ঢাকায় আসেন মনির। সেই রাতে তিনি ভাটারার নূরেরচালা এলাকায় তৃতীয় স্ত্রী ফাতেমা বেগমের বাসায় থাকেন। পরদিন পূর্বপরিচিত আলমগীর হোসেন ও তাঁর স্ত্রী লিপিসহ কয়েকজন তাঁকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তাঁর প্রথম স্ত্রী রেনুয়ারা বেগম স্বামীর ফোন বন্ধ পেয়ে লিপিকে কল দেন। কয়েকবার কল করার পর লিপি রিসিভ করলেও কোনো কথা বলেননি। তবে তখন মনিরের গোঙ্গানির শব্দ শুনতে পান রেনুয়ারা। পরে আর কোনো খোঁজ না পেয়ে তিনি ১২ জুন সকালে দেবর মো. সেলিমকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শাখায় স্বামীর পাসপোর্টের ফটোকপি দেখিয়ে তাঁর বিদেশে যাওয়ার তথ্য জানতে চান। ইমিগ্রেশন শাখা জানায়, মনির বিদেশে যাননি। এরপর তারা লিপির কাছে গেলে তিনি দাবি করেন, মনিরকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন। এ ঘটনায় অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা করেন রেনুয়ারা। প্রথমে বাড্ডা থানা পুলিশ, পরে ডিবি ও সিআইডি মামলার তদন্ত করে। শেষে তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
আবু বকর সিদ্দিক জানান, একটি সূত্রে মনিরকে হত্যা-সংক্রান্ত তথ্য পেয়ে তিনি খোঁজ নিতে শুরু করেন। জানতে পারেন, মনিরকে লিপি, মিন্টু ও আলমগীর মিলে হত্যা করে পুবাইল ফেরিঘাটের কাছে মেম্বার বাড়ির পুকুরপাড়ে ফেলে দেন।
এর আগে পিবিআই ঢাকা মহানগরের বিশেষায়িত তদন্ত ও অপারেশন্স (এসআইঅ্যান্ডও-দক্ষিণ) শাখার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সারোয়ার জাহান জানান, আনুষঙ্গিক সাক্ষ্য-প্রমাণে হত্যার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকার এসআইঅ্যান্ডও-উত্তর শাখার এসআই মোতালেব হোসেন বলেন, দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনোভাবে এ ঘটনায় লাভবান হয়েছেন এমন প্রমাণ মেলেনি। বিদেশে থাকা নয়ন মিয়ার সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা দরকার। এখন পিবিআইর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নিহত মনিরের স্বজনের দাবি, সৌদি আরবে মনির ও নয়ন একত্রে ক্যাটারিং ব্যবসা করতেন। সেই ব্যবসা দখল করতে নয়নের নির্দেশে আলমগীর, লিপি ও মিন্টু এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। তাদের মধ্যে আলমগীর ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মারা যান। হত্যায় ব্যবহৃত গাড়িটির মালিকও লিপি।
এদিকে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি নাবিলা জাফরিন মামলার বিষয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে দাবি করে বাদীপক্ষ। তবে অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, একই এলাকার হওয়ার সুবাদে অভিযুক্তরা আমার কাছে মামলাটির বিষয়ে বলেছিলেন। তাই খোঁজ নিয়েছিলাম। সমঝোতার কথা কাউকে বলিনি।
- বিষয় :
- হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন
- হত্যা
