ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে ফিরল একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক

সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে ফিরল একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক
×

সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবার দেখা যাচ্ছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পানির বোতল। সম্প্রতি তোলা -সমকাল

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫৫ | আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৬:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবার দেখা যাচ্ছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পানির বোতল। মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে ও ইফতার আয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছে প্লাস্টিকের বোতলজাত পানি। অথচ কয়েক মাস আগেও একই জায়গায় ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশে তল্লাশি, বিকল্প ব্যাগ সরবরাহ, সভা-সেমিনার ছিল প্লাস্টিকমুক্ত। এখন সেই অবস্থান শিথিল হওয়ায় সরকারে পরিবেশ অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সচিবালয়ের ভেতরে পলিথিন ও সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। প্রবেশমুখে তল্লাশির মাধ্যমে প্লাস্টিক বোতল নিয়ন্ত্রণ করা হতো। প্রয়োজন হলে কাগজের ব্যাগ সরবরাহ করা হতো। বিভিন্ন ভবনে সচেতনতামূলক বোর্ড টানানো হয়। সভা-সেমিনারে প্লাস্টিক বোতল, কাপ, প্লেট বা চামচ ব্যবহার বন্ধ ছিল। বিকল্প হিসেবে কাচের বোতল-গ্লাস, পাটজাত পণ্য, কাপড়ের বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে। পুরো কার্যক্রম তদারকিতে মনিটরিং টিমও কাজ করেছিল। এই উদ্যোগের নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তাঁর উদ্যোগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সব মন্ত্রণালয়কে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা দেয়। সরকার নিজে উদাহরণ তৈরি করে, যাতে বেসরকারি খাতও উৎসাহিত হয়।

পরিবেশবিদদের মতে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এসব প্লাস্টিক সহজে পচে না; মাটিতে শত বছর পর্যন্ত থেকে যায়। নদী-খাল পেরিয়ে সাগরে গিয়ে সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতি করে। ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে খাদ্যচক্রে ঢুকে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। পোড়ালে নির্গত হয় বিষাক্ত গ্যাস, যা শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, সরকারি দপ্তর যদি নিজেই প্লাস্টিকমুক্ত থাকতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। নীতির শুরুটা হতে হয় রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই।

সাম্প্রতিক সময়ে সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহার বাড়তে দেখা গেছে। পরিবেশবিদদের অভিযোগ, প্রশাসনিক শিথিলতা ও করপোরেট প্রভাবের কারণে আগের কঠোরতা আর বজায় নেই। বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আবারও সরবরাহের পথ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ উঠছে।
যদিও এ বিষয়ে সরকারের কোনো বক্তব্য মেলেনি। গতকাল একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন করা হলেও এই বিষয়ে তারা কথা বলতে রাজি হননি। গতকাল সন্ধ্যায়  পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। 

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্লাস্টিকবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। সচিবালয়ে প্লাস্টিক ব্যবহারের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে আগের নির্দেশনা পুনর্বহাল কিংবা আরও কঠোর করা হতে পারে।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পলিথিন-প্লাস্টিক দূষণ কমাতে দৃশ্যমান চেষ্টা করেছিল। পুরোপুরি সফল না হলেও অন্তত একটি নীতিগত অবস্থান তৈরি হয়েছিল। নতুন সরকারের উচিত ছিল বাজারে টেকসই বিকল্প সহজলভ্য করে এই দূষণ কমানো। উল্টো সরকারি অনুষ্ঠানে আবার প্লাস্টিক বোতল ফিরে আসা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তিনি বলেন, সচিবালয়ে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের এই প্রত্যাবর্তন সাময়িক নাকি স্থায়ী—সেটিই এখন দেখার বিষয়। একটি প্লাস্টিক বোতল ছোট বিষয় মনে হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিতে এর বার্তা বড়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি অফিস-আদালতে প্লাস্টিক ব্যবহার না করার নীতি নেওয়া হয়েছিল। তখন সভাগুলোতে কাঁচের বোতল ও গ্লাস ব্যবহার দেখা গেছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর আবার প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার শুরু হওয়া হতাশাজনক। অবিলম্বে আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে হবে। সচিবালয় যদি প্লাস্টিকমুক্ত থাকে, সেটি সারা দেশে পালন হবে। 

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেছেন, প্রায় ২২ বছর ধরে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক বন্ধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ ক্ষেত্রে কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং আংশিক সফলতাও পাওয়া গিয়েছিল। সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বোতল বা মিনারেল ওয়াটারের বোতলের ব্যবহার কমেছিল। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারণাও চালানো হয়। এতে একটি ইতিবাচক বার্তা গিয়েছিল যে, সরকার নিজে উদাহরণ তৈরি করতে চায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবার প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, সিঙ্গেল ইউজ প্লেট ও গ্লাসের ব্যবহার বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন ইফতার পার্টি ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

অধ্যাপক কামরুজ্জমান বলেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প সুলভে সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা স্বেচ্ছায় এই পণ্যের ব্যবহার থেকে বিরত থাকে। তাঁর মতে, নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাজারব্যবস্থা ও সামাজিক আচরণে পরিবর্তন আনতে পারলেই টেকসই সমাধান সম্ভব।

আরও পড়ুন

×