ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

২০২০ থেকে ছয় বছরে অগ্নিকাণ্ড ১৪৮৭৪৮

গ্যাস সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণ বাড়ছে

সরকারিভাবে হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান নেই

গ্যাস সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণ বাড়ছে
×

 বকুল আহমেদ 

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত উপকরণের ছিদ্র বা লিকেজ থেকে সারাদেশে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে মৃত্যু, দগ্ধ এবং ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। এ ছাড়া পাইপলাইনে সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটছে।

দগ্ধদের বেশির ভাগের ভাষ্য, তারা ঘরে গ্যাস লিকেজ টের পাননি। চুলা জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং মুহূর্তের মধ্যে শরীরে আগুন ধরে গেছে। 
২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগের বছর ঘটেছে ৭৪৮টি। অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় ২৯৩টি দুর্ঘটনা বেশি হয়েছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়লেও সিলিন্ডার আমদানি, বাজারজাত ও নিরাপত্তা-মান পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের তিন তদারক সংস্থা নির্বিকার।

গ্রাহকদের সচেতনতার ঘাটতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নির্বিকার ভূমিকার কারণে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সঠিক নিয়মে সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল না করা, মানহীন সুরক্ষা যন্ত্রাংশ ব্যবহার, সঠিক পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ বোতল, চুলার পাশে সিলিন্ডার রাখা দুর্ঘটনার বড় কারণ। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে হলে মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সমকালকে বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনা সিলিন্ডার লিকেজ থেকে হয়। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল, ভালভের কারণে লিকেজ হয়। এ ছাড়া নানা কারণে ঘরে জমে থাকা গ্যাসের গন্ধ এখন তেমন টের পাওয়া যায় না। আগুন জ্বালানো মাত্র বিপদে পড়ছেন বাসিন্দারা। তিনি বলেন, নিম্নমানের সিলিন্ডার অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে গ্যাসের চাপ বেড়ে বিস্ফোরণ হয়। সিলিন্ডারের মান অনুযায়ী হাইড্রোলিক পরীক্ষা করা হচ্ছে না। দুর্ঘটনায় সিলিন্ডার আমদানি থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার দায় রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো ও কেউ সঠিক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে সহায়তা করা হবে বলে জানান তিনি।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘সিলিন্ডারের ফিটিংসগুলো (নজল, ভালভসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ) ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী থাকে না। বাজারে ছাড়ার আগে পরীক্ষা করা আবশ্যিক হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা যথাযথভাবে করছে না। বেশির ভাগ সিলিন্ডার দুর্ঘটনায় ত্রুটি ও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ জন্য দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে হত্যা মামলা হিসেবে নিয়ে বিচারের দাবি জানিয়েছি। সত্যিকারের বিচার হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো যাবে। কিন্তু এসব তো হয় না। উল্টো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িতদের দায়মুক্তি দেয়।’

গত বছর ১০৪১; আগের পাঁচ বছরে ১২০৭ দুর্ঘটনা 
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড হয়েছে এক হাজার ২০৭টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে ১৩৫, ২০২১ সালে ১০৫, ২০২২ সালে ৯৪, ২০২৩ সালে ১২৫টি ও ২০২৪ সালে ৭৪৮টি দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালে গড়ে প্রতি মাসে ৬২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে সারাদেশে সিলিন্ডার ও এর সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, মাসে গড়ে ৮৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়া পাইপলাইনে সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাস লিকেজ থেকে ২০২৫ সালে ৫৬২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগের পাঁচ বছরে (২০২০ থেকে ২০২৪ সাল) এ সংখ্যা তিন হাজার ৫৪১। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৭২২, ২০২১ সালে ৭৮৯, ২০২২ সালে ৭৯৫, ২০২৩ সালে ৭৭০, ২০২৪ সালে ৪৬৫ ও ২০২৫ সালের ৫৬২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। 

২০২০ সাল থেকে পাঁচ বছরে সারাদেশে বিভিন্ন কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এক লাখ ২১ হাজার ৬৮৯টি। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে গ্যাস সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের গ্যাস থেকে। ২০২৫ সালে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। পাঁচ বছরে গ্যাস সিলিন্ডার এবং পাইপলাইনের লিকেজ থেকে দুর্ঘটনায় যথাক্রমে ২৭ ও ৩৪ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন যথাক্রমে ২৫৬ ও ১৯৩ জন। তবে বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থলে যেসব লাশ পান, সেসব তথ্য তারা রেকর্ড করেন। দগ্ধদের মধ্যে পরে চিকিৎসাধীন অনেকেই মারা গেলেও, এ তালিকায় স্থান পান না।

আগুনে পোড়া অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নেন ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসের তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময়ে সিলিন্ডার ও লাইনের গ্যাস লিকেজ-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন যথাক্রমে ১২১ ও ৬২ জন। দগ্ধ দুজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। ভর্তি রোগীদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন, সে তথ্য সমকাল জানতে পারেনি।
বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সমকালকে বলেন, গ্যাসের আগুনে দগ্ধ রোগীর সমস্যা বেশি হয়। বদ্ধ ঘরে দুর্ঘটনার কারণে শরীরে গভীর ক্ষত হয়। গ্যাস বা ধোঁয়ায় শ্বাসনালি পুড়ে যায়। দগ্ধের চেয়ে শারীরিক ট্রমার কারণে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, দগ্ধদের বেশির ভাগের ভাষ্য, তারা ঘরে গ্যাস লিকেজ টের পাননি। চুলা জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ হয়েছে।
গত বছরের ১৯ এপ্রিল মতিঝিলের ফকিরাপুলের গরম পানির গলিতে একটি বাসায় সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে আগুন লেগে তিনজন দগ্ধ হন। স্বজন জানান, রান্নার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়।

রাজধানীর বংশালের বাংলাদেশ মাঠে ঈদ উপলক্ষে বসানো মেলায় ফাস্টফুডের দোকানে গত বছর ৩১ মার্চ রাতে একটি সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ হয়। এতে ছয়জন দগ্ধ হন।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, সিলিন্ডারের মুখে থাকা নজল নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটির সঙ্গে হোসপাইপ লাগিয়ে অন করা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারে নজল দুর্বল হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তিনি বলেন, সিলিন্ডারে গ্যাস ভরলে চাপ তৈরি হয়। প্রতিটি সিলিন্ডারের নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা ও লাইফটাইম থাকে। সিলিন্ডার পাঁচ থেকে সাত বছরের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়। দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে সিলিন্ডার ও এর যন্ত্রাংশ সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।

কী বলছে তদারক সংস্থাগুলো
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, কোনো স্থানে দুর্ঘটনা ঘটলে গুরুত্ব বুঝে পরিদর্শন করা হয়। এর মাধ্যমে আমরা ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করার চেষ্টা করি। তবে জনবল সংকটের কারণে সব দুর্ঘটনা কিংবা এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে নজরদারি করা সম্ভব হয় না।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সমকালকে বলেন, দুর্ঘটনার বিষয় দেখার দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদপ্তরের। জনবল সংকটেও তারা প্রচুর কাজ করছে। তিনি বলেন, আমাদেরও জনবল কম। সব কোম্পানির কার্যক্রম তদারক করা সম্ভব হয় না। সব সিলিন্ডার বিতরণকারীকে লাইসেন্সের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। আগামী জানুয়ারি থেকে লাইসেন্স ছাড়া কাউকে যেন সিলিন্ডার দেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

বিএসটিআইর পরিচালক (পদার্থ) শাহাদৎ হোসেন বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিলিন্ডার আমদানি কিংবা উৎপাদনকারী কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। ভালভ বা যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে দুর্ঘটনা ঘটে। নিয়মিত পরীক্ষা না করে পুরোনো যন্ত্রাংশ ব্যবহারে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

শঙ্কা বাড়ছে মফস্বলেও
রাজধানীর অদূরে সাভার-আশুলিয়া এলাকায় দেড় বছরে সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের গ্যাস লিকেজের ৩৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৩ জন নিহত ও অন্তত ৪২ জন আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেই দায় সারে স্থানীয় প্রশাসন।

রংপুর ফায়ার সার্ভিস জানায়, বিভাগের আট জেলায় গত বছরের প্রথম ৯ মাসে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৫৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক বাদশা মাসউদ আলম জানান, সিলিন্ডার লিকেজের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তারা মানুষকে সচেতন করার জন্য প্রতি শনিবার পাড়া-মহল্লায় অগ্নিনির্বাপণের মহড়া পরিচালনা করছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগে ২০২০ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে সিলিন্ডার লিকেজে ১৫৫ ও পাইপলাইনজনিত কারণে ৬৯৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান জানান, নগর ও শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে।

খুলনা বিভাগে গত বছরের প্রথম ৯ মাসে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৮৬টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকে দগ্ধ হন। একজনের মৃত্যু হয়েছে। খুলনা এলপিজি গ্যাস দোকান মালিক সমিতির সভাপতি তোবারক হোসেন তপু বলেন, এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির জন্য বিস্ফোরক লাইসেন্স আবশ্যক। কিন্তু নগরীর অধিকাংশ বিক্রেতার কোনো লাইসেন্স নেই। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কোনো ঘটনার পর প্রশাসনের লোকজন পরিদর্শন করে দায় সারেন।

বরিশাল বিভাগে পাইপলাইনের গ্যাস নেই। গৃহস্থালিসহ সব ধরনের কাজে সিলিন্ডার ব্যবহৃত হয়। ফায়ার সার্ভিসের বিভাগীয় দপ্তর সূত্র জানায়, গত বছর প্রথম ৯ মাসে বিভাগের ছয় জেলায় ৬২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ২০২১ সাল থেকে চার বছরে এ সংখ্যা ৯৫।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সাভারের নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল ব্যুরো, রংপুর অফিস এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধি)

 

আরও পড়ুন

×