ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে কিডনি রোগের ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে কিডনি রোগের ঝুঁকি
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে কিডনি রোগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০১০ সালে দেশে কিডনি রোগে আক্রান্তের হার ছিল ১৫-১৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০-২২ শতাংশে। দেশের তিন জেলায় পরিচালিত কিডনি স্ক্রিনিং কর্মসূচির তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পেয়েছে কিডনি ফাউন্ডেশন।

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও কিডনি রোগ: ঝুঁকি ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য জানান কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ। বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) এই বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাম্পসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কিডনি রোগ এখন এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, সংক্রমণ, ভেজাল খাদ্য, কীটনাশকের ব্যবহার, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্য সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। অথচ এ রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রসঙ্গে এম এ সামাদ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা, তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বিশুদ্ধ পানির সংকট মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ করে কিডনি রোগের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে  কিডনি রোগ বহু গুণে বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বক্তারা বলেন, অতিরিক্ত গরমে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষ, যেমন– কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক ও রিকশাচালকদের মধ্যে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেশি থাকে। এতে কিডনির ওপর চাপ পড়ে এবং কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জোবায়দা বেগম বলেন, কিডনি রোগ শুধু ব্যক্তির নয়; পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অনেক রোগী চিকিৎসাবঞ্চিত অবস্থায় মারা যান। তবে সচেতনতা বাড়াতে পারলে প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও খাদ্যদূষণ, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বাস্থ্যগত ভোগান্তি বেড়েছে। কিডনি রোগের মতো জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ বলেন, দেশের ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মাত্র ১৫০ টাকায় স্ক্রিনিং করে প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে ৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। তিনি বলেন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ আমিষ গ্রহণ কিডনি সুরক্ষায় সহায়ক।
ডা. হারুন উর রশিদ বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিসের তুলনায় কিডনি প্রতিস্থাপন বেশি কার্যকর। তিনি আরও বলেন, ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী যে কোনো সুস্থ নিকটাত্মীয় কিডনি দান করতে পারেন। এ ছাড়া মৃত ব্যক্তির অঙ্গদানের মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার কিডনি বিকল রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক লাইন ডিরেক্টর (এনসিডিসি) অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন, পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আফরোজা বেগম, বিএসপিডির সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. রেজাউল আলম, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব খোন্দকার মোস্তান হোসেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির, বাংলা একাডেমির উপপরিচালক মোকারম হোসেন, পরিবেশবিদ ড. মোহাম্মদ একরামুল ইসলাম, বিজিএমইএর চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলীম, ক্যাম্পসের নির্বাহী সম্পাদক রেজওয়ান সালেহীন এবং বিজিএমইএর পরিচালক মিজানুর রহমান পিন্টু।

আরও পড়ুন

×