অবৈধ মুনাফা কমায় সক্রিয় পুরোনো সার সিন্ডিকেট
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে সার আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার দাবি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক বাজারদর যাচাই করে দরপত্র মূল্য নির্ধারণ, সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ এবং ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের ফলে সরকারের শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা। তবে এই পরিবর্তনে ক্ষুব্ধ হয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও ডিলারের একটি অংশ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পুরোনো এই চক্র কখনও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, কখনও অপপ্রচার, আবার কখনও আদালতে গিয়ে নতুন নীতিমালা ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ধাপে পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার টন সার আমদানিতে প্রায় ২৩৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। অতীতে প্রতিটি টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হলে ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা যেত বলেও মন্ত্রণালয়ের হিসাব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত দেড় দশকে সার খাতে কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী শক্ত অবস্থান তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে একই মালিকানার একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্র জমা দেওয়া হতো। পরে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে দর নির্ধারণ করে কাজ ভাগাভাগি করা হতো। ফলে বাইরে প্রতিযোগিতা থাকলেও ভেতরে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকত। এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় সর্বনিম্ন দরদাতা না হয়েও কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ পেত। এতে বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে সরকারকে সার কিনতে হতো। অতীতে আমদানি করা সার গুদামে না পৌঁছানোসহ বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনাও ঘটেছে। এতে সরকারের শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সিন্ডিকেট ভাঙতে দরপত্র ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে সরকার। এখন দরপত্র জমা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারদর যাচাই করে একটি দাপ্তরিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সর্বনিম্ন দরও যদি সেই দামের বেশি হয়, তাহলে সেই দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয় না; বরং নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহে আগ্রহী দরদাতাদের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থায়ও সংস্কার আনা হয়েছে। আগে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের জন্য আলাদা ডিলার থাকলেও এখন সব ধরনের সার একই ডিলারের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকদের ভোগান্তি কমছে। একই সঙ্গে ডিলার থেকে সাব-ডিলার হয়ে একাধিক ধাপে হাতবদল কমানোর উদ্যোগ নেওয়ায় মাঠ পর্যায়ে দাম বাড়ার সুযোগও সীমিত হচ্ছে। এ ছাড়া ডিলারের সংখ্যা বাড়ানো, অনিয়মে জড়িতদের বাদ দেওয়া এবং আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত ডিজিটাল নজরদারি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নীতিমালা পরিবর্তনের পর থেকেই মাঠে সক্রিয় হয়েছে পুরোনো সিন্ডিকেট– এমন অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের। কিছু ব্যবসায়ী সার মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়ানোর ঘটনাও ঘটছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারদর যাচাই এবং প্রতিযোগিতা বাড়ায় একচেটিয়া মুনাফার সুযোগ কমে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠীগুলো এখন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছে। তারা জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ একাধিক কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে সম্পন্ন হয় এবং উপদেষ্টা পর্যায়ের অনুমোদনের পরই কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ফলে এককভাবে কোনো কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
সার আমদানির নতুন সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী উচ্চ আদালতে মামলা করে। হাইকোর্টের রায় তাদের বিরুদ্ধে গেলে তারা আপিল বিভাগে একাধিক মামলা করলেও শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। কর্মকর্তাদের দাবি, আদালতের এই রায়ের ফলে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এর পর থেকেই বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি ও অপপ্রচার বাড়ানো হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাঠে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির খবর পেয়েছিলাম। তারপর আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে জেলায় জেলায় মনিটরিং জোরদার এবং দফায় দফায় অভিযান করে ওই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন আর মাঠে সারের কোনো সংকট নেই। তিনি বলেন, সার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে যে সংস্কার হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে।
- বিষয় :
- সিন্ডিকেট
