জাপান বিজনেস ডের সেমিনারে বক্তারা
নীতি প্রয়োগের অনিশ্চয়তায় জাপানি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৮:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে বিনিয়োগ নীতির ন্যায্য প্রয়োগের নিশ্চয়তা না থাকায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাপানের ব্যবসায়ীরা। তাদের বক্তব্য, বিনিয়োগকারীদের কাছে ব্যবসায় খরচের চেয়ে ইতিবাচক পরিবেশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অপ্রত্যাশিত করারোপ, দুর্বল নীতি প্রয়োগ এবং পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা ক্রমাগত বিনিয়োগ খরচ বাড়াচ্ছে ও কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। গতকাল ‘জাপান বিজনেস ডে’ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে তারা এসব অভিযোগ তোলেন। রাজধানীর একটি হোটেলে জাপান দূতাবাস, জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই) এবং জাপানিজ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ইন ঢাকার (জেসিআইএডি) যৌথ উদ্যোগে সেমিনাটির আয়োজন করা হয়।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচিসহ জেট্রো, জেবিসিসিআই, জেসিআইএডি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে এশিয়া ও ওশেনিয়ায় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে ২০২৫ জেট্রো সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। জাপানের ব্যবসায়ীরা জানান, নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং নির্ভরযোগ্য বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উৎপাদন খাতের ওপর আরও বেশি জোর দিয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চতর জাপানি বিনিয়োগ চায় বাংলাদেশ। দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা অর্জনের জন্য যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বৃহত্তর প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য সরকার নীতি সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ, শক্তিশালী বাজারভিত্তিক তদারকি এবং চুক্তি প্রয়োগের উন্নতি।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে হলে কর প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে হবে। অনির্দিষ্ট কর প্রয়োগের বোঝা কমাতে হবে। পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা এড়াতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন। এছাড়া ডিজিটালকরণের মাধ্যমে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে সুগম করা, সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করা, সম্পূর্ণ কার্যকর ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু, দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন তিনি।
শু-কু-কাইয়ের প্রেসিডেন্ট মানবু সুগাওয়ারা বাংলাদেশের সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব তুলে ধরে বলেন, পরস্পরবিরোধী নির্দেশনার কারণে বিনিয়োগ বিলম্ব হয় ও খরচ বাড়ে। সম্পূর্ণ ডিজিটাল, সুবিন্যস্ত এবং সময়বদ্ধ অনুমোদন, লাইসেন্স ও নবায়নসহ একটি কার্যকর ওয়ান-স্টপ পরিষেবা চালুর আহ্বান জানান তিনি। ভিসা ও পারমিট পেতে ক্রমাগত বিলম্বের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
মিতসুবিশি করপোরেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ হিরোশি উয়েগাকি জাপানি সংস্থাগুলোর জন্য বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী করতে মৌলিক সংস্কারের আহ্বান জানান। আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং কার্যক্রমকে আরও মসৃণ করতে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) গুরুত্ব তুলে ধরেন।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তারেক রফি ভূঁইয়া বলেন, ইপিএ একটি নিয়মভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে জাপানে নিরবচ্ছিন্ন বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার করবে।
জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য আইনি নিশ্চয়তা দেয় এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য পরিবেশকে শক্তিশালী করে।
২০২৫ জেট্রো সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপনকালে জেট্রো ঢাকার কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা বলেন, জাপানি ব্যবসার জন্য বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। তিনি প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মনজুর বলেন, বাংলাদেশের উচিত নিজেকে একটি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, জাপানে রপ্তানি করা এবং বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে একীভূত হওয়া।
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জাপানের সঙ্গে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের অধীনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আশাব্যঞ্জক। সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যে দুর্বল সহযোগিতা বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করে।
- বিষয় :
- নীতিমালা
