ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
কাঠামোগত দুর্বলতা, অসম্পূর্ণ সংস্কার এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই নতুন সরকার তার প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ব্যয় করার ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য চাপে রয়েছে এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা আগের দুর্বলতাগুলোকে আরও প্রকট করেছে। তাই কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এমন মত দিয়েছেন প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর ভাষায়, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সরকারকে ‘নির্দয়’ হতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফ, মমতাজুল জান্নাত প্রমুখ।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী বাজেটকে প্রভাবিত করছে এমন চারটি প্রধান চাপ আছে। প্রথমত, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া কাঠামোগত দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণ সংস্কারের প্রভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের বকেয়া সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার চাপ রয়েছে। তৃতীয়ত, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, কম রাজস্ব আদায় ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত। চতুর্থত, রেমিট্যান্স, রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বৈদেশিক ঋণ ও পরিশোধ–সব ক্ষেত্রেই চাপ রয়েছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পর্যাপ্ত সম্পদ ছাড়া বাজেটের আকার ও কার্যকারিতা বাড়ানো কঠিন। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ এখন ‘কঠোর বাজেট সীমাবদ্ধতা’র পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে নীতিনির্ধারকদের বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কারণে সরকারের ঋণ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণ পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় সামলাতে নতুন করে বিদেশি ঋণ নেওয়ার সুযোগও কমে গেছে। ঋণ নেওয়ার সীমাবদ্ধতা থাকলে টাকা ছাপানোর ঝুঁকি তৈরি হয়, যা মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুযোগ্য গভর্নর থাকার পরও টাকা ছাপাতে হয়েছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়তি ব্যয়ের সুযোগ নেই। আয়-ব্যয়ের কাঠামো বাস্তবসম্মত করতে হবে।
তিনি মনে করেন, আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ ধরাই যৌক্তিক হবে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত তিন থেকে চার মাসের একটি কার্যকর রূপরেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি এটিকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে তিন বছর মেয়াদি মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো প্রণয়ন করা যেতে পারে।
ব্যয় কমাতে ভর্তুকি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ভর্তুকির সুবিধা দরিদ্র নাকি ধনী পাচ্ছেন, তা যাচাই করতে হবে এবং নগদ প্রণোদনা ধাপে ধাপে কমাতে হবে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ভর্তুকি বাড়বে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনায় একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর মতে, এডিপিকে পরিষ্কার ও কার্যকর না করে আগের মতো প্রকল্প নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
অবাস্তব বাজেট না করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, রাজস্ব আয়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নিতে হবে। এতে বাজেটের আকার ছোট হলেও সমস্যা নেই। প্রয়োজনে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হবে। রাজস্ব বাড়াতে কর অবকাশ কমানো, করের হার যুক্তিযুক্ত রাখা, করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটালাইজেশন ও কর আদায়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি ও জ্বালানি সংকট
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করেছে। এতে রাজস্ব স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ঝুঁকিতে পড়ছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি বিকল্প সীমিত করতে পারে। রাশিয়া থেকে সস্তা তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন প্রয়োজন হয়ে পড়ছে, যা বহুপক্ষীয় বাণিজ্যের নমনীয়তা কমিয়ে দিচ্ছে। এই চুক্তির ফলে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, জ্বালানির ক্ষেত্রে বর্তমানে তিন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি, জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়া। এতে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পার। ফলে বৈদেশিক ঘাটতি বাড়বে এবং টাকার মান কমে যেতে পারে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে জিডিপির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
পে স্কেল পুনর্বিবেচনার পরামর্শ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে সুপারিশ রেখে গেছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য প্রলম্বিত দায় তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, নতুন করে কমিশন গঠন করে বিষয়টি পর্যালোচনা করা উচিত এবং আগের বেতন কমিশনের প্রতিবেদনকে সহায়ক হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
- বিষয় :
- দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
