ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিমত

শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার শঙ্কা থাকে

শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন  ধরনের বৈষম্য তৈরি  হওয়ার শঙ্কা থাকে
×

মনজুর আহমদ

মনজুর আহমদ

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্ব অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট শুধু উন্নত দেশগুলোকেই নয়, উন্নয়নশীল দেশেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বেড়ে যাওয়া, জ্বালানির ঘাটতি এবং সরবরাহ সংকট– সব মিলিয়ে দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিন দিন সশরীরে ও তিন দিন অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তা সময়োপযোগী হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সামনে এনে দিয়েছে।

প্রথমত, এই সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী বলা যাবে না। কারণ, কভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা ইতোমধ্যে অনলাইন শিক্ষার একটি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। তখন জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি, অনলাইন শিক্ষা চালু করা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। বিশেষ করে একটি দেশে যেখানে ডিজিটাল বৈষম্য এখনও প্রকট, সেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়।

শহর ও গ্রামের মধ্যে এই বৈষম্য সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। শহরের অনেক শিক্ষার্থী তুলনামূলকভাবে ভালো ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্টফোন বা কম্পিউটার এবং অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ পায়। তবে গ্রামের বা প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য এসব সুবিধা প্রায়ই অধরা থেকে যায়। অনেক জায়গায় ইন্টারনেটের গতি অত্যন্ত ধীর, আবার কোথাও কোথাও সংযোগই স্থিতিশীল নয়। ফলে নিয়মিত অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। 

এর পাশাপাশি রয়েছে ডিভাইসের সমস্যা। একটি পরিবারের একাধিক শিক্ষার্থী থাকলে সবার জন্য আলাদা ডিভাইস কেনা অনেক সময় সম্ভব হয় না। এমনকি অনেক পরিবারে একটি স্মার্টফোনও নেই। ফলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণে তারা পিছিয়ে পড়ে। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার শঙ্কা থাকে, যেখানে কিছু শিক্ষার্থী এগিয়ে যাবে আর কিছু শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়বে।
শুধু শিক্ষার্থীই নয়, শিক্ষকের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। অনলাইন ক্লাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজন বিশেষ ধরনের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ। অনেক শিক্ষক এখনও সেই প্রশিক্ষণ যথাযথভাবে পাননি। ফলে অনলাইন ক্লাস কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত রাখা, তাদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা এবং প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলো সামাল দেওয়া– এসবই বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে এই সীমাবদ্ধতা থাকার পরও বাস্তবতা হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প পথ খুব বেশি নেই। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কিছু না কিছু পদক্ষেপ নিতেই হবে। সেই জায়গা থেকে এই সিদ্ধান্তকে আপৎকালীন বা অস্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়, বরং এটি সংকট মোকাবিলার কৌশল।

এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– এই অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাকে যতটা সম্ভব কার্যকর করে তোলা। শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের উচিত হবে ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দেওয়া, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। পাশাপাশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্পমূল্য বা বিনামূল্যে ডিভাইস সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, যাতে তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দক্ষতার সঙ্গে পাঠদান করতে পারেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্যও কিছু নির্দেশনা বা সহায়তা দেওয়া দরকার, যাতে তারা এই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, এ পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তাই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরিকল্পনা জরুরি। হয়তো ভবিষ্যতে অনলাইন ও সশরীরে শিক্ষার একটি সমন্বিত পদ্ধতি (হাইব্রিড মডেল) আরও গুরুত্ব পাবে। সেই বাস্তবতার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

আমি মনে করি, সরকার যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তা যথেষ্ট তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই নিচ্ছে। এখন প্রয়োজন সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। তাহলেই এই সংকটের মধ্যেও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল রাখা সম্ভব হবে। তা ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা যাবে। সারাদেশে একই নিয়ম না করে প্রথমে এটা শহরে শুরু করা যেতে পারে।
লেখক : প্রফেসর ইমেরিটাস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আরও পড়ুন

×