ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মশার কামড়ে গবাদি পশুর ‘তিন দিনের জ্বর’ বাড়ছে

মশার কামড়ে গবাদি  পশুর ‘তিন দিনের  জ্বর’ বাড়ছে
×

মশার উপদ্রব থেকে গবাদি পশু রক্ষা করতে দিনের বেলায়ও মশারি টানিয়েছেন এক খামারি। মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার মঙ্গলপুর গ্রামের একটি খামার থেকে তোলা হাফিজুর রহমান

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৮ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের খাটাইল গ্রামের মহসিন শেখের খামারে ১০টি ফ্রিজিয়ান গরু রয়েছে। তিনি প্রতিদিন তিনটি গরু থেকে ৫০ থেকে ৬০ লিটার দুধ পাচ্ছিলেন। দুই সপ্তাহ ধরে দুটি গরু মশার কামড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এতে গরু দুটি খাওয়া কমিয়ে দেয়। ফলে দুধ উৎপাদনও কমে যায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর পর গরু কিছুটা সুস্থ হয়েছে। 

শুধু মানুষ নয়, মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে গবাদি পশুও। সিলেট, কুমিল্লা এবং বগুড়া থেকেও একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে।

মশার কামড় থেকে নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে গবাদি পশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার কামড়ে গরু, ছাগল, মহিষসহ অন্যান্য গৃহপালিত পশুর বোভাইন এফিমেরাল ফিভার বা তিন দিনের জ্বর বাড়ছে। গবাদি পশুর অন্যান্য মশাবাহিত রোগের মধ্যে রয়েছে লাম্পি স্কিন ডিজিজ, থাইলেরিওসিস, অ্যানাপ্লাজমোসিস ও ব্লুটাং ভাইরাস। এসব রোগে আক্রান্ত পশু দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে, দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে।

গবাদি পশুকে মশা থেকে রক্ষায় প্রাণিসম্পদ বিভাগের তেমন উদ্যোগ নেই। খামারিরা সন্ধ্যার পরপর মশারি ও নেট টানিয়ে, কয়েল ও ধূপ জ্বেলে অবলা প্রাণীদের মশার কামড় থেকে রক্ষার চেষ্টা করছেন। 

দাকোপ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বঙ্কিম কুমার হালদার জানান, গত এক মাসে মশা-মাছির কামড়ে আক্রান্ত হওয়া ৩৬৮টি গরু, ৪৯টি ছাগল এবং ৩৬টি ভেড়ার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই আট থেকে ৯ গরু এবং পাঁচ-ছয়টি ছাগল ও ভেড়া আসছে। তিনি বলেন, মশার উপদ্রবে হাঁস-মুরগিও অসুস্থ হচ্ছে। এসব প্রাণীকে হাসপাতালে আনতে হয় না। সংবাদ দিলে খামারিদের বাড়ি বাড়ি গিয়েই চিকিৎসা এবং ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, খুলনায় মোট গবাদি পশু রয়েছে ১৪ লাখ চার হাজার ৪৪৫টি। এর মধ্যে গরু রয়েছে সাত লাখ ৩২ হাজার ৪৬৮টি। গাভি উৎপাদন খামার রয়েছে ১৮৭টি। মশার উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের আঙ্গারদহ গ্রামের খামারি আবু রায়হান শেখের চারটি গরু ও সাতটি ছাগল রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মশার কামড়ে প্রাণীগুলোর শরীর বিভিন্ন স্থানে ফুলে যাচ্ছিল। প্রাণিসম্পদ অফিসে গেলে কিছু ওষুধ দিয়েছে। বাইরে থেকে আরও ৬০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। এখন গোয়ালঘরে মশারি টানিয়েছি এবং সন্ধ্যায় গোয়ালঘরের আশপাশে ধোঁয়া দিচ্ছি।’

গত সোমবার গরুর চিকিৎসার জন্য ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণী হাসপাতালে যান বারুইখালী গ্রামের বাসন্তী মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘মশার আক্রমণে গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে গরুটি অসুস্থ। ডাক্তার দেখানোর পর ইনজেকশন ও পাউডার দিয়েছে।’

ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, মশার কামড়ে অসুস্থ গরু, ছাগল নিয়ে মানুষ প্রাণিসম্পদ দপ্তরে আসে। গত এক মাসে প্রায় ৩৫০ প্রাণীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সাধ্যমতো সরকারি ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। কিছু ওষুধ অফিসে নেই, সেগুলো বাইরে থেকে কেনার জন্য খামারিদের ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হচ্ছে। 

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মশার কামড়ে গবাদি পশুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ হয়। এতে গরুর চামড়ায় গুটি দেখা দেয়, জ্বর হয় এবং দুধ উৎপাদন কমে যায়। আমরা প্রতিটি উপজেলায় ভ্যাকসিন পাঠিয়েছি। খামার ও গোয়ালঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মশারির ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’ 
খুলনা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. অহিদুজ্জামান জানান, মশক নিধনে প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্রাশ প্রোগ্রাম চলছে। সকালে হ্যান্ড স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে মশার ডিম নিধনের ওষুধ এবং বিকেলে ফগার মেশিনের মাধ্যমে উড়ন্ত মশা নিধনের কাজ চলছে। এ ছাড়া প্রতি শনিবার বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অংশ হিসেবে ড্রেন ও খাল পরিষ্কার করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে মশা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

মশার কামড়ে ছটফট করে গবাদি পশু
প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের আসামপাড়া হাওর গ্রামের ফিরোজ মিয়ার শুরু হয় অন্য এক যুদ্ধ। গরুকে মশার কামড় থেকে বাঁচাতে গোয়ালঘরে কয়েল ও ধূপ জ্বালান। পাঁচ-ছয়টি গরু রক্ষা করা তাঁর কাছে এখন নিত্যদিনের সংগ্রাম। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা হলে মশার যন্ত্রণায় মানুষই টিকতে পারে না। অবলা প্রাণীরা মশার কামড়ে সারারাত ছটফট করে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরকারি কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি।’ 

গোলাপগঞ্জ উপজেলার শ্রীমান চন্দ জানান, মশার উপদ্রব এত বেড়েছে, দিনের বেলায় গোয়ালঘরে কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। রাতে কয়েলের পরিমাণ বাড়াতে হয়। চার-পাঁচটি মশার কয়েল না জ্বালালে সারারাত গবাদি পশু লাফাতে থাকে।

গোলাপগঞ্জ উপজেলার সব জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে মশার উপদ্রব চলে এলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শুধু এই উপজেলা নয়, সিলেটের ১৩টি উপজেলার অবস্থা একই।
গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জুনায়েদ কবির করেন, মশা নিধন কর্মসূচি উপজেলা ও পৌরসভা থেকে পরিচালিত হয়। চলতি বছর উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে ৪৮ হাজার ৬৮৮টি গবাদি পশুর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

জেলা ভেটেরিনারি অফিসার রণজিত কুমার আচার বলেন, ‘খামারিরা দিনে-রাতে মশারি টানিয়ে পশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। সম্প্রতি গবাদি পশুর মধ্যে মশাবাহিত রোগ বেড়েছে। মশার উপদ্রব বাড়লে গবাদি পশুর জ্বর দেখা দেয়। এটাকে ‘তিন দিনের জ্বর’ বলা হয়।’

সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) মশা নিধনে ফগার মেশিন পরিচালনা, লার্ভিসাইড ছিটানো ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এই কার্যক্রম মূলত মূল সড়ক ও শহর এলাকায় সীমাবদ্ধ। 

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তৎপরতা নেই
বগুড়া সদরের সাবগ্রাম এলাকার খামারি মাহবুর রহমান বলেন, দেড় মাস ধরে মশার ব্যাপক উপদ্রব দেখা দিয়েছে। সন্ধ্যায় গরুর ঘরে ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ানো ছাড়াও রাতে মশারি টানাতে হয়।

ধুনট উপজেলার পাকুড়ীহাটা গ্রামের খামারি ধুনট সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা জানান, মশার উপদ্রব এত বেশি, গোয়ালঘরে প্রতি রাতে দু-তিনটি কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। তাও মশা যায় না। গাভি সারারাত ছটফট করে। ফলে দুধ কম হচ্ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কাজী আশরাফুল ইসলাম বলেন, মশা নিধনের জন্য কেমিক্যাল কেনা বা মশারি কেনার জন্য সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ নেই। তাই খামারিদের বাজার থেকে কেমিক্যাল কিনে স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে গোয়ালঘর নিয়মিত পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কুমিল্লায়ও একই চিত্র
কুমিল্লা জেলা সদরসহ উপজেলা পর্যায়ে মশার উপদ্রপের কারণে গরু, মহিষ ও অন্যান্য গবাদি পশুপাখির মশাবাহিত লাম্পি স্কিন ডিজিজ, বোভাইন এফিমেরাল ফিভার (তিন দিনের জ্বর) বাড়ছে। তবে জেলা পশুসম্পদ বিভাগে এর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। 

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম সমকালকে বলেন, মশাবাহিত এসব রোগে কিছু আক্রান্ত থাকলেও তা মহামারি আকারে ধারণ করেনি। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে এসব রোগ তিন-চার দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।

(সংশ্লিষ্ট ব্যুরো ও প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য)

 

আরও পড়ুন

×