এখনও ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র সুযোগ নিয়ে প্রশাসক নিয়োগ
রাজীব আহাম্মদ
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৩ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে যে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র বিধান করেছিল, সেটি এখনও ব্যবহার করছে নির্বাচিত সরকার। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমেই সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। যদিও বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে– স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ ও জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হবে না।
শুধু ‘বিশেষ পরিস্থিতি’তে করা অধ্যাদেশের ব্যবহার নয়; সেগুলোকে আইনে পরিণত করতে যাচ্ছে সরকার। যদিও অন্য ধারায় বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকারের এই দুটি স্তরে ১৮০ দিনের বেশি সময়ের জন্য প্রশাসক নিয়োগ করা যাবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উপজেলা ও পৌরসভায় শিগগির নির্বাচন হবে। কবে হতে পারে, সে বিষয়ে কিছু বলছে না সরকার।
জামায়াত-এনসিপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বলছে, সংসদ নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পর আর ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ নেই। তাই দ্রুত নির্বাচন হতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরে সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা ও উপজেলা পরিষদ-সংক্রান্ত ১৩টি অধ্যাদেশও রয়েছে।
দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি বিশেষ পরিস্থিতি-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপান্তর করবে। কারণ, যেহেতু অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে, সেহেতু এগুলো আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে পাস না করলে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ বাতিল বা অবৈধ হয়ে যাবে। অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত হলে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা স্থায়ীভাবে সরকারের হাতে থাকবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ আমলের জনপ্রতিনিধিরা পালিয়ে গিয়েছিলেন। যারা ছিলেন, তারাও স্বচ্ছ ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের বিধান করেছিল। এখন সে পরিস্থিতি নেই। তাই অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। সরকারের হাতে অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা থাকলে স্থানীয় সরকারেরই প্রয়োজন নেই।
অভ্যুত্থানের পর বিশেষ পরিস্থিতির বিধান
২০২৪ সালের অধ্যাদেশগুলো জারির আগে কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি অপসারণ করত পারত না। অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের বিধান করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১০ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট এক দিনে স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ জারি করে। এসব অধ্যাদেশে সিটি করপোরেশন আইন, জেলা পরিষদ আইন, উপজেলা পরিষদ আইন এবং পৌরসভা আইন সংশোধন করা হয়। এতে সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিল অপসারণের ক্ষমতা সরকারকে দিয়ে বিধান যুক্ত করা হয়। জেলা এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সদস্যদের অপসারণে একই রকম ক্ষমতা দেওয়া হয় সরকারকে। স্থানীয় সরকারের সব পদে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতাও দেওয়া হয়।
এই ক্ষমতাবলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার এক দিনে দেশের ১২ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলরকে অপসারণ করে। এর বিরুদ্ধে কাউন্সিলররা রিট করলে হাইকোর্ট গত বছরের জানুয়ারিতে রুল জারি করেন, যা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
একই সময়ে বিশেষ পরিস্থিতির বিধানবলে ৬১ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য, ৩৩০ পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর, ৪৯৫ উপজেলার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণ করে সরকার। শুধু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বহাল রাখা হয়। তবে যেসব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পলাতক ও কারাগারে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নির্বাচিত সরকারের আমলে অধ্যাদেশ ব্যবহার
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল। এর সমালোচনা করেছিল বিএনপি। পরে মার্চে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। তখনও বিএনপির বিরোধিতায় তা হয়নি। জামায়াত ও এনসিপি তখন সংসদের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সংসদের আগে স্থানীয় নির্বাচনেও রাজি ছিল না।
তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলটি নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর দুই দফায় বিএনপি নেতাদের ১১ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রশাসক দেয়। এ ছাড়া আদালতের রায়ে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন দলটির নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন। করপোরেশনের মেয়াদ গত ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হলেও তিনি পদে রয়ে গেছেন।
আগে ছিল ‘অবস্থা বিশেষ’
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোতে স্থানীয় সরকারকে ব্যাপক ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তা কমায়। ২০১১, ২০১২, ২০১৬ ও ২০২২ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের আইনগুলোতে ‘অবস্থা বিশেষে’ সরকারকে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এগুলোতে বলা হয়েছে– ‘কোনো সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা বিভক্ত হলে, মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে, নতুন করপোরেশন, পৌরসভা বা পরিষদ গঠিত হলে সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে।’
তবে উপজেলা পরিষদে ‘অবস্থা বিশেষে’ প্রশাসক নিয়োগের বিধান নেই। ২০২৪ সালের অধ্যাদেশে ১৩(ঘ) এবং ১৩(ঙ) ধারা যুক্ত করে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানদের অপসারণ এবং প্রশাসক নিয়োগের বিধান করা হয়।
২০১১ সালে ঢাকাকে দুই সিটি করপোরেশনে বিভিক্ত করার পর, চার বছর প্রশাসক নিয়ে কার্যক্রম চালায় আওয়ামী লীগ সরকার। করোনার কারণে নির্বাচন না হওয়ায় ২০২১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১৮ সালে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন গঠিত হলে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে ৬১ জেলা পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে আগের চেয়ারম্যানদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব নিয়োগ ছিল ১৮০ দিনের জন্য।
১৮০ দিনের বেশি প্রশাসক নয়
অধ্যাদেশের ২৫(ক) ধারায় ১১ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন। অধ্যাদেশেও বলা হয়েছে, এই আইনে বা অন্য আইনে যা কিছু বলা থাকুক, বিশেষ পরিস্থিতির বিধানে নিয়োগ করা প্রশাসকরা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
তবে ২০০৯ সালের সিটি করপোরেশন আইনের ২৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সিটি করপোরেশনের প্রতিষ্ঠা, বিভক্তি, মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সরকার ১৮০ দিনের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে। কোনো প্রশাসক ১৮০ দিনের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন হবে বলে আইনে বলা হয়েছে।
২০০০ সালের জেলা পরিষদ আইনেও বলা হয়েছে, কেউ ১৮০ দিনের বেশি প্রশাসক পদে থাকতে পারবেন না। আইনের ৮২(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রশাসক পদে কোনো ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের সময়কাল কোনোক্রমেই একাধিকবার বা ১৮০ দিনের বেশি হবে না।’
তবে ২০২৪ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে যুক্ত করা ৮২(ক) ধারায় গত ১৫ মার্চ ৪২ জেলায় প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
পৌরসভা আইনেও ১৮০ দিনের বেশি সময়ের জন্য প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই। তবে অধ্যাদেশের ধারাবলে সরকারি কর্মকর্তারা ১৯ মাস ধরে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।
উল্টো পথে বিএনপি
২০২৩ সালের জুলাইয়ে বিএনপির ঘোষণা করা ৩১ দফার ২০ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ‘ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হবে। যাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হবে। মৃত্যুজনিত কারণ কিংবা আদালতের আদেশে পদ শূন্য না হলে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাহী আদেশে বরখাস্ত, অপসারণ করা হবে না।’
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার থেকে সংসদ; প্রতিটি স্তরে সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।
বিএনপি ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহার থেকে সরে এসেছে কিনা– এমন প্রশ্নে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সমকালকে বলেন, দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন আর জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ খুবই সাময়িক সময়ের জন্য। খুব শিগগির স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে যাবে সরকার; প্রস্তুতি চলছে।
বিএনপি ৩১ দফায় অনড় রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রশাসক নিয়োগ না করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও জনগণের সেবাপ্রাপ্তি অবারিত করতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এসব স্থানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কারণ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনগণের তেমন সম্পৃক্ততা না থাকায় সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন।
জামায়াত দ্রুত নির্বাচন চায়
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির সদস্য ও জামায়াতের এমপি রফিকুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, আমরা বিশেষ পরিস্থিতির অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে চাই না। সেটি হলে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের পুতুলে পরিণত হবে। স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান সমকালকে বলেন, সংবিধানে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার হবে নির্বাচিত। কিন্তু সরকার দলীয়করণের উদ্দেশ্যে দলের নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসাচ্ছে। বিশেষ পরিস্থিতির বিধান আইনে পরিণত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অভ্যুত্থানের পর দেশে বিশেষ পরিস্থিতি নেই। গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে বিশেষ বিধান নয়; নির্বাচন প্রয়োজন।
একই অবস্থান এনসিপির। দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সমকালকে বলেন, প্রশাসক নিয়োগের নামে প্রতিষ্ঠান দখল না করে সরকার নির্বাচন দিক। জনসমর্থন থাকলে তারা জিতবে। পেছনের দরজা দিয়ে স্থানীয় সরকার দখল চলবে না।
