ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মশা নিয়ন্ত্রণে কেউ মানছে না জাতীয় নির্দেশিকা

মাঠ পর্যায় থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয় না

মশা নিয়ন্ত্রণে কেউ মানছে না জাতীয় নির্দেশিকা
×

 অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৪৪ | আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীসহ দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন– কোনো এলাকাতেই মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি জাতীয় নির্দেশিকা থাকলেও স্থানীয় সরকারের কোনো সংস্থা সে অনুযায়ী কাজ করছে না। সিটি করপোরেশনগুলোর নিজস্ব নির্দেশিকা আছে। তারাও সেটা মেনে নিয়ন্ত্রণমূলক কাজ করছে না। ফলে মশার বিস্তার ঘটছে। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে রাজধানীসহ পুরো দেশের মানুষ। সারাবছর মানুষ মশাবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। 

মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২১ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হয়। এর পরপরই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের জন্য প্রণয়ন করা হয় ‘মশক নিধন স্থায়ী নির্দেশিকা’। দুই নির্দেশিকাতেই মশক নিয়ন্ত্রণে করণীয়, মশককর্মী, তাদের তত্ত্বাবধায়কসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। 

জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিবছরের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য মশক নিয়ন্ত্রণের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের কথা। সমকাল স্থানীয় সরকারের একাধিক স্তরে কথা বলে জানতে পেরেছ, এ বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা কোনো পর্যায় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগে কখনও আসেনি।

জাতীয় নির্দেশিকায় বলা আছে, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন প্রতি মাসে মশা পরিস্থিতির ওপর প্রতিবেদন দেবে। প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তির সমন্বয়ে এ বিষয়ক কমিটি করা হবে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের একটি কমিটি আছে বা থাকতে হবে, তা অনেকে জানেন না।

নির্দেশিকায় বলা আছে, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা তাঁর ওয়ার্ডের মশার বিস্তার নিয়ে প্রতি মাসে চেয়ারম্যানকে জানাবেন। বিভিন্ন এলাকার চারজন বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তারা জানিয়েছেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কেউই কাজটি করেননি। নির্দেশিকার বিষয়টিও জানেন না তারা। 

বরিশালের আগৈলঝাড়ার বাকাল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তিনবারের ইউপি সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাজ্যেশ্বর রায় বলেন, ‘মশা-সংক্রান্ত কোনো তথ্য ইউনিয়ন বা উপজেলা পরিষদ আমার কাছে চায়নি। আমিও কোনো প্রতিবেদন দিইনি। কখনও আমাকে কোনো সভায় ডাকা হয়নি, কোনো কিছু বরাদ্দও দেওয়া হয়নি।’ 
পৌরসভার ক্ষেত্রেও ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কাছ থেকে মশা সম্পর্কিত তথ্য প্রতি মাসে জেলা পরিষদকে জানাতে বলা আছে নির্দেশিকায়। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দেশের সব পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিলরকে বরখাস্ত করায় পদগুলো এখন শূন্য। 

সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের সাবেক মেয়র আবদুল হান্নান তালুকদার বলেন, ‘গত বছর পৌরসভায় মশা মারার চারটি যন্ত্র দেওয়া হয়েছিল। কিছু দিনের মধ্যে যন্ত্রগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এ জন্য মশা মারা যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলররা ওয়ার্ডের মশার বিস্তার নিয়ে  প্রতিবেদন দেননি। আমিও জেলা পরিষদে এ রকম প্রতিবেদন পাঠাইনি। তবে বছর তিনেক আগে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে মশা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এরপর আর কখনও মশার প্রসঙ্গ বৈঠকে ওঠেনি।’ 

নেত্রকোনার সাবেক এক পৌর মেয়র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এ ধরনের কমিটির কথা আমার জানা নেই। আমার কাউন্সিলররাও কখনও মশা নিয়ে প্রতিবেদন দেননি। তবে সব ওয়ার্ডেই মশা আছে। ওষুধ স্বল্পতার কারণে মশা মারতে পারিনি।’

জেলা পর্যায়ে মশক নিয়ন্ত্রণে ২৬ সদস্যের একটি কমিটি থাকার কথা বলা আছে নির্দেশিকায়। তারা প্রতি মাসে একটি সভা করে মশার বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন দেবে। এ কমিটির সদস্যরা হলেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন, জনপ্রতিনিধি, শীর্ষ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা, এনজিও প্রতিনিধি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি।  

গাইবান্ধা জেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাদিউজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘মশা-সংক্রান্ত কোনো সভায় কখনও ডাকা হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না।’
২০২১ সালের আগস্টে জাতীয় নির্দেশিকাটি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। নির্দেশিকাটি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড থেকে জেলা পর্যায়ের কমিটি গঠন ও প্রতি মাসে একটি করে সভা করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি প্রতিবছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদ মশার মাত্রা বিবেচনা করে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তা জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

নির্দেশিকা মানে না সিটি করপোরেশনও
নির্দেশকার শুরুতেই বলা আছে, বছরজুড়ে মশক নিধন কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা ছাড়াও ময়লা, পচা পানি, নালা-নর্দমা, ড্রেন, সেপটিক ট্যাঙ্ক, জলাভূমি, ঝোপঝাড় ও ফেলে দেওয়া পাত্রে সকাল-বিকেল ওষুধ স্প্রে করতে হবে। লার্ভা নিধনের জন্য সকালে অ্যাডাল্টিসাইডিং এবং উড়ন্ত মশা মারার জন্য বিকেলে লার্ভিসাইডিং স্প্রে করতে হবে। 

নির্দেশকা অনুযায়ী, মশককর্মীরা এ দায়িত্ব পালন করবেন। তারা ঠিকমতো কাজ করছেন কিনা, সেটা তদারক করবেন মশক সুপারভাইজার। প্রতি ওয়ার্ডে ১০ জন মশককর্মী এ কাজ করবেন। ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার বেগে হেঁটে তারা ফগিং করবেন। 

কোনো বাসাবাড়ির ভেতরে এডিস মশার উৎসস্থলের তথ্য থাকলে তারা ওষুধ স্প্রে বা ফগিং করে উৎসস্থল ধ্বংস করবেন। এ ক্ষেত্রে ওই অবকাঠামোর মালিকদের কাছ থেকে নির্ধারিত কাগজে সই সংগ্রহ করবেন। 

আর কিউলেক্স মশার ক্ষেত্রে কোনো ভবন মালিক তাঁর ভবনের বেজমেন্ট বা অভ্যন্তরে ওষুধ ছিটাতে চাইলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে আবেদন করবেন।
বাস্তবে এমন আবেদন হয় না বললে চলে। তবে কেউ কেউ মৌখিকভাবে স্থানীয় কাউন্সিলরকে ফোন করে বাসার নিচে ওষুধ ছিটানোর অনুরোধ করেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মশককর্মী দেখলে বাসিন্দারা অনুরোধ করে বা সামান্য কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাদের বাসার ভেতরে নিয়ে ওষুধ ছিটিয়ে নেন। আবার অনেক বাসার মালিক অভিযোগ করেন, টাকা না দিলে মশককর্মীরা বাড়ির ভেতর ওষুধ ছিটান না। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমদাদুল হক বলেন, সবাই সিটি করপোরেশনের দোষ দেখে। মশককর্মীরা কাজ করতে গেলে তাদের সঙ্গে অনেকে দুর্ব্যবহার করেন। ওষুধ ছিটিয়ে বাড়ির মালিকের কাছ থেকে দু-একজন বকশিশ নেয়; সেটাই ফলাও করে প্রচার করা হয়। 

মশক নিধন কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব থাকে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের হাতে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করার কারণে এ কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহবুবুর রহমান তালুকদার সমকালকে বলেন, ‘আমাদের মশককর্মীর সীমাবদ্ধতা আছে। ঢাকা শহরের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত সমস্যা আছে। অনেক ড্রেনে পানিপ্রবাহ বন্ধ। এ রকম পরিস্থিতিতে মশার উৎসস্থল ধ্বংস করা কঠিন।’ তিনি বলেন, তার পরও তারা মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করেছেন।  

আরও পড়ুন

×