ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ চায় রিহ্যাব

বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ চায় রিহ্যাব
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১১ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন না করার নিশ্চয়তা চেয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। এ ক্ষেত্রে সংগঠনটি আয়কর অধ্যাদেশের পুরোনো ধারা (১৯ বিবিবিবিবি) পুনঃপ্রবর্তনের দাবি জানিয়েছে। 

গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় এসব দাবি তুলে ধরেন রিহ্যাব নেতারা। প্রাক-বাজেট আলোচনায় আবাসন, নির্মাণ, চামড়া, চা শিল্পসহ আরও ১২টি সংগঠন তাদের বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে। কিছু প্রস্তাব বিবেচনার আশ্বাস দেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। আবার কিছু প্রস্তাব নাকচও করেন তিনি।

সভায় রিহ্যাব সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, জমি নিবন্ধনের কর কমিয়ে যৌক্তিক করলে রাজস্ব আদায় বাড়বে। ভবন নির্মাণ ও জমি উন্নয়ন– দুই ক্ষেত্রেই তাদের মূসক দিতে হয়। তিনি গেইনকর, স্ট্যাম্প শুল্ক ও সব ফ্ল্যাটে ২ শতাংশ মূসক ধার্য করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সব ধরনের কংক্রিট ব্লককে ভ্যাটমুক্ত রাখার দাবি জানান।

রিহ্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, প্রবাসীদের অনেকে ভুলে হোক বা না বুঝে হোক তাদের প্রেরিত অর্থ ঘোষণা করেননি। ফলে তাদের সে অর্থ এনবিআরের কাছে কালো টাকা হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে অনেকে এই টাকাটা বাইরে বিনিয়োগ করছে। 

রিহ্যাব বলছে, দেশে সেকেন্ডারি ফ্ল্যাট মার্কেটের ব্যবস্থা নেই। নিবন্ধন ফি ও ট্যাক্স মিলিয়ে মোট সাড়ে ৪ শতাংশ হারে পুনঃবিক্রয়ের ব্যবস্থা করা গেলে সেকেন্ডারি মার্কেট সৃষ্টি হবে। এতে একই ফ্ল্যাট হাতবদল হলে রাজস্ব আয় বাড়বে। এ ছাড়া নগরায়ণকে উৎসাহিত করতে ঢাকা ও অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় পাঁচ বছর এবং পৌরসভার বাইরের এলাকায় ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে সুবিধা চায় রিহ্যাব।

জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, জমির নিবন্ধন খরচ বিক্রেতার দেওয়ার কথা। কিন্তু এখানে ক্রেতার ওপর এটা চাপানো হয়। প্রশ্ন ছাড়া কালো টাকা বিনয়োগের প্রস্তাব নাকচ করে তিনি বলেন, এখন বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো সহজ। বিদেশ থেকে ব্যাংক কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বৈধভাবে অর্থ আনা সহজ। এ ক্ষেত্রে প্রণোদনাও রয়েছে। সুতরাং এখন আর এসব কথা চলবে না। দীর্ঘদিন ধরে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে, এখন আর সে পথে হাঁটার সুযোগ নেই। প্রবাসীদের নির্ধারিত হারে কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করতে হবে। 

সভায় সিমেন্ট উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিসিএমএর সভাপতি আমিরুল হক বলেন, বর্তমানে সিমেন্ট ক্লিংকার আমদানিতে শুল্ক অ্যাসেসেবল ভ্যালুর ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। এটি টনপ্রতি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা দরকার। এ ছাড়া সিমেন্টের কাঁচামাল-ক্লিংকার, স্লাগ, লাইমস্টোন, ফ্লাই অ্যাশ এবং জিপসাম আমদানিতে বিদ্যমান দুই থেকে পাঁচ শতাংশ অগ্রিম আয়কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা উচিত।

বিসিএমএ বলছে, সিমেন্টের দাম মানুষের নাগালে রাখতে আমদানি পর্যায়ে ২ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা দরকার। এতে সিমেন্টের দাম কমবে এবং উৎপাদনকারীদের চলতি মূলধন ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। পাশাপাশি সিমেন্ট বিক্রি পর্যায়ে বিদ্যমান ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন মৌজা মূল্য সরেজমিন দেখে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির সচিব একেএম নওশেরুল আলম বলেন, প্রতি শতাংশ জমিতে দেড় লাখ টাকা উৎসে কর দিতে হয়। এটা উঠিয়ে দিয়ে দলিল মূল্যের ওপর ৩ শতাংশ হারে নির্ধারণ করা যায়। 

এর জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, দলিল মূল্যের ওপর ভিত্তি করে কর নির্ধারণে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে সেই দলিল মূল্য হতে হবে প্রকৃত। তিনি বলেন, বর্তমানে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই স্ট্যাম্পে সই করে মিথ্যা মূল্য হলফনামা দিতে হচ্ছে, যা একটি জাতির জন্য সম্মানজনক নয়। মানুষ যাতে হয়রানি ছাড়া শান্তিতে আইন অনুযায়ী কর দিয়ে ঘুমাতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

সিরামিক উৎপাদানকারীদের সংগঠন বিসিএমইএ বলেছে, সিরামিক একটি প্রসেস ইন্ডাস্ট্রি। এর প্রধান কাঁচামাল চায়না ক্লে ও বল ক্লে প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান। আমদানি করা এসব মাটির সঙ্গে আবহাওয়া ও পরিবহনের কারণে প্রচুর পরিমাণ পানি বা ময়েশ্চার এবং অব্যবহার্য রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত থাকে। বর্তমানে শুল্কায়নের সময় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এই অপচয় বিবেচনা না করেই মোট ওজনের ওপর শুল্ক ধার্য করছে। ফলে উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত শুল্ক গুনতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই প্রকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্কায়ন করতে হবে। 

চামড়া ও অন্যান্য খাতের প্রস্তাব
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি খাতের সংগঠন বিএফএলএলএফইএ বলেছে, তৈরি পোশাকের মতো চামড়া খাতও শতভাগ রপ্তানিমুখী। পোশাক খাতে করপোরেট কর ১২ শতাংশ হলেও চামড়া খাতে এই হার অনেক বেশি। রপ্তানি আয় ও বিনিয়োগ বাড়াতে এই কর হার কমিয়ে পোশাকশিল্পের সমান করতে হবে। এ ছাড়া রপ্তানির বিপরীতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপিকে পুরোপুরি কার্যকর করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।

ট্যানারি শিল্প মালিকদের সংগঠন বিটিএ রাসায়নিক আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে শূন্য থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার ও সিইটিপি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণকে সামনে রেখে ওষুধ উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ দীর্ঘ মেয়াদে নীতি সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ওষুধ শিল্প মালিকরা।

এ ছাড়া প্রাক-বাজেট আলোচনায় টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, প্লাস্টিক ও রাবার জুতা মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বিভিন্ন খাত তাদের ওপর আরোপিত শুল্ক, কর ও ভ্যাট কমানোর প্রস্তাবনা তুলে ধরে।

আরও পড়ুন

×