চাঞ্চল্যকর ৪ হত্যা মামলার তদন্ত কবে শেষ হবে
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২৫ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা চাঞ্চল্যকর কয়েকটি হত্যা মামলার তদন্তে কিছুটা গতি আসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। সরকারের দায়িত্বশীলরা দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এর মধ্যে বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ড তদন্তে গঠন করা হয় টাস্কফোর্স।
নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী ও কুমিল্লার শিক্ষার্থী-নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্টরাও নড়েচড়ে বসেন। দীর্ঘ সাত বছর পর কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার বিচারে নেওয়া হয় উদ্যোগ।
সরকারের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য ও তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের তৎপরতায় আশাবাদী হয়ে ওঠেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই তারা কাঙ্ক্ষিত বিচার পাবেন– এমন কথাও বলেন কেউ কেউ। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি তদন্ত। এখনও জানা যায়নি আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডগুলোয় কারা জড়িত, কেন তাদের হত্যা করা হয়। শুধু একরামুল হত্যার ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। যদিও সেই প্রতিবেদনের বিষয়ে এখনও পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে এসব মামলার বিচার এতদিন হয়নি। বর্তমান সরকার ভালো উদাহরণ তৈরি করতে চাইলে দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচারের ব্যবস্থা করতে পারে। এটি জনগণের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দেবে। আর প্রমাণ না পেলে উন্নত দেশের মতো মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান পদ্ধতিও ব্যবহার করতে পারে পুলিশ।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন সমকালকে বলেন, মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল হওয়ায় তদন্তে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এসব মামলা তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্তের গতি বাড়াতে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। চূড়ান্তভাবে আদালতে টেকসই অভিযোগপত্র দাখিল করাই পুলিশের প্রধান অগ্রাধিকার।
ত্বকী হত্যার বিচারে ১৩ বছরের অপেক্ষা
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর খোঁজ মিলছিল না তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর। পরে ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার এক বছরের মাথায় র্যাব জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদেরই টর্চার সেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করে।
র্যাব-১১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন। আমরা কাজ করছি।’ তবে তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং কবে নাগাদ প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দিতে পারত। অবশ্য তাদের সময়ে প্রমাণ বা আলামত সংগ্রহের কিছু কাজ হয়েছে। সম্প্রতি র্যাব আমাকে বলেছে, তদন্ত শেষ পর্যায়ে। আমি চাই, এ পর্যন্ত জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে, তারা কেউ যেন বাদ না পড়ে।’
সাগর-রুনি হত্যা মামলা কোন পথে
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচারের অপেক্ষায় একে একে ১৪টি বছর কেটে গেছে স্বজন ও সহকর্মীদের। অন্তর্বর্তী সরকার এই মামলার তদন্তে টাস্কফোর্স গঠন করায় নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন সবাই। তবে এখনও আশাব্যঞ্জক কোনো খবর মেলেনি। বরং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শেষ পর্যন্ত প্রমাণ না করতে পারলে এই মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হতে পারে।
টাস্কফোর্সের প্রধান পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘মামলার রহস্যভেদ করার মতো কোনো উপাদান এখনও আমরা পাইনি। তবে আমরা আশাবাদী। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাব।’
সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তদন্তে সত্যিটা উঠে আসবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু এখন হতাশ। আদৌ কোনো দিন বিচার পাব কিনা, জানি না।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ফ্ল্যাট থেকে সাগর-রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
তনু হত্যা: ডিএনএ মেলানোর উদ্যোগ
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি ঝোপের মধ্যে ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুর লাশ পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, ধর্ষণের পর তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
গত ১০ বছরে চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে ছয়বার। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান পিবিআই ঢাকা মহানগর উত্তরের বিশেষায়িত তদন্ত ও অভিযান বিভাগের পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা ডিএনএ মেলানোর উদ্যোগ নিয়েছি, আশা করি রহস্যভেদ হবে।’
এর আগে ৬ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লার একটি আদালত অবসরপ্রাপ্ত তিন সেনাসদস্যের ডিএনএ প্রোফাইল মিলিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।
তনুর ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল বলেন, ‘আগের (অন্তর্বর্তী) সরকার সুষ্ঠু তদন্ত করতে চেয়েছিল, কিন্তু কোনো কারণে শেষ পর্যন্ত আর হয়নি। এখন নতুন সরকার যদি চায়, তাহলে হয়তো বিচার পাব।’
একরাম হত্যার বিচার নিয়ে কী জানা যাচ্ছে
২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হক। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় সাত বছর কোনো আইনি পদক্ষেপই নেওয়ার সাহস পায়নি তাঁর পরিবার। অবশেষে গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগম।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান আনসার উদ্দিন খান পাঠান বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এখন প্রসিকিউটর চাইলে ট্রাইব্যুনালে এটির বিচার শুরু হতে পারেন বা তিনি সাধারণ আদালতেও বিচারের জন্য পাঠাতে পারেন।’
একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, ‘মূল আসামি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন। নতুন সরকারের কাছে দাবি, তাদের খুঁজে এনে বিচার করুন।’
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, নতুন সরকারের জন্য এটা প্রাইম টাইম। এখনই এসব মামলার বিচারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তবে দেখার বিষয় হলো, সরকারের সেই সদিচ্ছা আছে কিনা। তারা যদি এটিকে রাজনৈতিকভাবে দেখতে চায়, তাহলে আর বিচার হবে না।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, চাঞ্চল্যকর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো সরকারই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এই কারণে জড়িতরা সুযোগ পেয়েছে। অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং সফলও হচ্ছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আইনের শাসনই মূলকথা। অপরাধীরা যদি বিচারের আওতায় না আসে, তাহলে কথার বাস্তবায়ন হবে না।
- বিষয় :
- হত্যা মামলার রায়
- মামলা
