ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ লাইন্স একাডেমি ও ফাঁড়ির প্রস্তাব

জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ লাইন্স একাডেমি ও ফাঁড়ির প্রস্তাব
×

 সাহাদাত হোসেন পরশ 

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:১০ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য বারবার আলোচনায় এসেছে। সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল পাহাড়ঘেরা এই অঞ্চল। গত ৯ মার্চ এলাকাটিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির তিন হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেন। এখন সেখানে পুলিশের ৪০০ সদস্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে নজরদারি করছেন। তবে জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেখানে রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) পুলিশ লাইন্স, পুলিশ একাডেমি, তদন্ত ও ফাঁড়ি তৈরি চিন্তাভাবনা চলছে। 
আসন্ন পুলিশ সপ্তাহে এসব প্রস্তাব নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তোলা হতে পারে। গতকাল শুক্রবার একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। 

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) নাজিমুল হক সমকালকে বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এখন আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাহাড়ের ওপর সন্ত্রাসীদের যেসব চেকপোস্টের মতো স্থাপনা ছিল, এসব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে এখন শঙ্কা নেই। সন্ত্রাসীরা বুঝে গেছে, তারা এখন সলিমপুরে নিরাপদ নয়। তাই অনেকে গা-ঢাকা দিয়েছে।  
তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, ফাঁড়ি, কারাগারসহ– এমন বেশ কিছু  সরকারি স্থাপনার প্রস্তাবনা রয়েছে।  

আরআরএফ হলো পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট, যা মূলত রেঞ্জ ডিআইজির অধীনে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া বর্তমানে পুলিশের একমাত্র একাডেমি রয়েছে রাজশাহীর সারদায়। পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিমত, জঙ্গল সলিমপুরের মতো জায়গায় এই ধরনের স্থাপনা তৈরি করা গেলে সেখানে আইনশৃঙ্খলায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।  

পুলিশ সূত্র বলছে, আগামী ১০ মে থেকে এবারের পুলিশ সপ্তাহ শুরু হয়ে চার দিনব্যাপী চলবে। অন্য সময়ের মতো এবারও পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরা হবে। যেসব বিষয় সামনে আসতে পারে তার মধ্যে রয়েছে, স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন। সাইবার অপরাধ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে অপপ্রচার, গুজব, উস্কানিমূলক প্রচারণা, ব্যক্তির চরিত্র হরণ, প্রতারণা ও ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বাড়ানোর সুযোগে সাইবার অপরাধীরা অনলাইনে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সাইবার অপরাধের শিকার ৮৯ শতাংশ ভুক্তভোগী লোকলজ্জার ভয়ে মামলা করেন না। অল্প মামলা হলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ৭২ শতাংশ মামলা খারিজ হয়ে যায়। পূর্ণাঙ্গ সাইবার ইউনিট না হলে ডিজিটাল জালিয়াতি ও অপরাধ মোকাবিলা করা কঠিন বলে মনে করছেন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা। 

এ ছাড়া এবারের পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীর সদস্যদের পদোন্নতির যে জটিলতা, তা আলোচনায় উঠতে পারে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিসিএস ৩০তম পুলিশ ব্যাচের ১৮১ সদস্য জুনে তাদের চাকরিজীবনের ১৫ বছরে পদার্পণ করবেন। ৩১তম ব্যাচের ১৮১ জনের চাকরিকাল ১৪ বছরে পদার্পণ করেছে। বিসিএস অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা এরই মধ্যে পঞ্চম গ্রেডে উন্নীত হলেও বিসিএস পুলিশ ব্যাচের সদস্যরা পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড মতে, এএসপি হিসেবে পাঁচ বছর চাকরি করার পর অতিরিক্ত এসপি, ১০ বছর পূর্তিতে এসপি (গ্রেড-৫), ১৪ বছর পার হলে অতিরিক্ত ডিআইজি, ১৮ বছর পর ডিআইজি (গ্রেড-২) ও ২০ বছর পূর্তি হলে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারা হিসেবে বিভিন্ন ক্যাডারে বিবেচিত হয়ে আসছে। পুলিশেও এই ধারায় পদোন্নতি পেলে বঞ্চিতদের সংখ্যা কমবে ও কাজেও গতিশীলতা আসবে। 

এদিকে পুলিশের দুটি পুলিশ প্রশিক্ষণ সেন্টার (পিটিসি) গঠনের প্রস্তাব আসতে পারে। পুলিশের প্রশিক্ষণের জন্য ১৯৯০ সালে ওই সময়ের সাংগঠনিক কাঠামো বিবেচনায় টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, রংপুর ও খুলনায় চারটি পিটিসি স্থাপন করা হয়। ওই সময় পুলিশের জনবল ছিল ৭৯ হাজার ৪৫৬ জন। বর্তমানে পুলিশের জনবল দুই লাখ ৭ হাজার ৭৪৫ জন। পুলিশ সদস্য বাড়লেও নতুন কোনো পিটিসি স্থাপন করা হয়নি। কনস্টেবল থেকে এএসআই, এসআই থেকে পরিদর্শক– এর প্রতি ধাপে পদোন্নতিতে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বড় সংখ্যক উপযুক্ত জনবল প্রশিক্ষণের জন্য সারাবছর অপেক্ষমাণ থাকে। বর্তমানে আট বিভাগে চারটি পিটিসি রয়েছে। প্রতি বিভাগের জনবলের জন্য দূরত্ব বিবেচনায় একটি পিটিসি থাকা প্রয়োজন। শিগগির সেটি সম্ভব না হলে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জে ও বরিশালে পিটিসির স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা কথা তুলে ধরবে পুলিশ।  

এ ছাড়া ময়মনসিংহ মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠনের প্রস্তাবনা আসতে পারে। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনা নিয়ে ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠিত হয়। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন হওয়ায় ভালুকা, ত্রিশাল ও কোতোয়ালি থানা এলাকায় শিল্প কলকারখান স্থাপনের গতি বাড়ছে। দেশের আটটি বিভাগীয় শহরের সাতটি বিভাগীয় শহরে নগর সুরক্ষায় মহানগর পুলিশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট যানজট, শিল্পায়নের কারণে অনেক সময় শ্রমিক অসন্তোষ, ধর্মঘট মোকাবিলা করা জেলা পুলিশের পক্ষে এককভাবে  কঠিন। ময়মনসিংহ মহানগর পুলিশ প্রতিষ্ঠিত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে আশাবাদী ওই কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরিবেশ পুলিশ ইউনিট গঠনের বিষয়টি এবারের পুলিশ সপ্তাহে গুরুত্বসহকারে আসতে পারে। এর পক্ষে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য হলো– নদী, খাল, বন দখল, বালু, পাথর-ইটভাটার মাধ্যমে বায়ুদূষণ, পাহাড় কাটা, মাটির ওপরের স্তর উত্তোলন, মানবসৃষ্ট অপরাধ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায়ই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। পরিবেশ রক্ষা আইন ১৯৯৫ থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে এ-সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকানো যাচ্ছে না। পরিবেশ পুলিশ নামে নতুন ইউনিটি স্থাপন করলে এই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন পুলিশ সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া রংপুর বিভাগে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রস্তাব আসতে পারে। প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে এক বা একাধিক ব্যাটালিয়ন থাকলেও বৃহত্তর রংপুর বিভাগে আর্মড পুলিশের কোনো ব্যাটালিয়ন নেই। তাই ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী জেলায় চোরাচালান, মাদক নিয়ন্ত্রণে ১৫ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন রংপুর নামে একটি স্বয়ংসর্ম্পূণ ব্যাটালিয়ন গঠন প্রয়োজন।

এদিকে ব্যারাক বিশিষ্ট ইউনিটকে বাড়ি ভাড়ামুক্তকরণ করতে চায় পুলিশ। ব্যারাক মানেই এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলাভিত্তিক পরিবেশ। নিয়মিত রোল কল, ড্রিল, ব্রিফিং, প্রয়োজনীয় অস্ত্রাগার, খাবারের জায়গা, পার্কিং, শৌচাগার, গোসলের জায়গা, রান্নাঘর ব্যারাকে থাকতে হয়। ভাড়া বাড়িতে স্থান সংকুলান হয় না। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটের জন্য জমি, নিজস্ব ভবন প্রতিষ্ঠা করা ও ব্যারাকভিত্তিক ইউনিটকে ভাড়া জায়গা থেকে সরিয়ে নিজস্ব স্থাপনায় নেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

এছাড়া বগুড়ায় শিল্প পুলিশের জন্য একটি জোন স্থাপনের প্রস্তাবনা আসতে পারে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের শিল্প পুলিশ সম্প্রসারণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের যুক্তি, তাঁতশিল্পের জন্য সিরাজগঞ্জ বিখ্যাত। নীলফামারী অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য শিল্প পুলিশের সাব-জোন দরকার। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মধ্যবর্তী অঞ্চল বগুড়ায় শিল্প পুলিশ জোন প্রতিষ্ঠিত হলে দুই বিভাগের শিল্প এলাকাকে নিরাপত্তাবেষ্টনীতে আনা যাবে।

আরও পড়ুন

×