টিআরএনবির সেমিনার
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গৃহীত টেলিযোগাযোগ নীতি পর্যালোচনার আহ্বান
টিআরএনবির সেমিনার
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০০:২৬
বাংলাদেশে ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াতে কানেকটিভিটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার যে পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে টেলিযোগাযোগ খাতের নীতিগত কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ ও পর্যালোচনার দাবি উঠে এসেছে শিল্প উদ্যোক্তা ও অংশীজনদের কাছ থেকে।
আজ শনিবার টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (টিআরএনবি) আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা বলেন, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ—এই তিনটি বিষয় ভারসাম্যপূর্ণ না হলে কাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল রূপান্তর ব্যাহত হতে পারে।
কানেকটিভিটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিজিটালভাবে সক্ষম বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, ‘এই লক্ষ্য অর্জনে কানেকটিভিটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। শক্তিশালী নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ছাড়া ডিজিটাল সেবা বিস্তৃত করা সম্ভব নয়।’
মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড ব্যবহারে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে উল্লেখ করে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, এই ঘাটতি পূরণে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে তিনি ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ভবিষ্যতে নীতি প্রণয়নে এই বিষয়টি আরও কেন্দ্রীয় হয়ে উঠবে।
তিনি আরও জানান, সব নাগরিককে একটি সমন্বিত ডিজিটাল আইডি প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে সরকারি সেবা গ্রহণ ও আর্থিক লেনদেন একক ব্যবস্থায় আনা সম্ভব হবে।
নীতি নিয়ে উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো গাইডলাইনে বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর জন্য একাধিক স্তরে লাইসেন্স সুবিধা রাখা হলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য তুলনামূলক সীমিত সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে আজ বৈশ্বিকভাবে নিরাপত্তার সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই নীতিগত কাঠামোতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা বিদ্যমান নীতি পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান এবং একটি স্বচ্ছ ও সমান সুযোগভিত্তিক কাঠামো তৈরির দাবি তোলেন।
টিআরএনবি সভাপতি সমীর কুমার দে-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সব পক্ষের মতামত নেওয়া হলেও সব দাবি পূরণ করা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি জানান, নীতির মূল লক্ষ্য ভয়েস সেবা থেকে ডেটা সেবায় রূপান্তর, যা বাস্তবায়নে সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, শহরে ইন্টারনেট তুলনামূলক ভালো হলেও গ্রামাঞ্চলে এখনো নেটওয়ার্ক দুর্বলতা রয়ে গেছে। তিনি নীতি প্রণয়নে পক্ষপাতহীন অবস্থানের আহ্বান জানান।
ফাইবার অ্যাট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে স্পষ্ট আইন ও সীমারেখা থাকা জরুরি। অতীতে অবকাঠামো উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বড় বিনিয়োগ থাকলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
আইএসপিএবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম হাকিম বলেন, আইএলডিটিএস নীতির আওতায় এনটিটিএন সেবা চালুর ফলে ইন্টারনেট পরিবহন ব্যয় কমেছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তবে বিদ্যমান নীতিমালা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।
অ্যামটবের মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, মোবাইল অপারেটররা দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে তারা আরও বিস্তৃতভাবে সেবা দিতে সক্ষম হবে।
নীতিগত ভারসাম্যের দাবি
সেমিনারে বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোক্তারা মনে করেন, বিদ্যমান নীতিমালার একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা করা না হলে খাতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
