টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিচ্ছে না সরকার: অর্থমন্ত্রী
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকার নতুন করে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিচ্ছে না। এ সম্পর্কে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা মিথ্যা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমন মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, সরকার ঋণের জন্য টাকা ছাপানো বা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অতিরিক্ত ঋণের পথে যাবে না। গতকাল শনিবার সচিবালয়ে সংবাদপত্রের সম্পাদক, টেলিভিশন চ্যানেলের সিইও এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাফের (ইআরএফ) সদস্যদের সঙ্গে পৃথক প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
গত বৃহস্পতিবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান এক সেমিনারে জানান, মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এটি হাইপাওয়ারড মানি বা ছাপানো টাকা, যার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। সরকার এমন পথে যাবে না। তিনি বলেন, অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ এড়ানো এবং বেসরকারি খাতের ওপর চাপ না দেওয়া সরকারের নীতির মূল ভিত্তি। তিনি বলেন, ‘পৃষ্ঠপোষকতামূলক রাজনীতির কারণে অর্থনীতি কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। বাংলাদেশ অর্থনীতি অলিগার্কদের হাতে চলে গিয়েছিল। এখন সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণে গুরুত্ব দিচ্ছ।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়ার খবর সত্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে উপায় উপকরণ অ্যাকাউন্টের সীমা ১২ হাজার কোটি টাকা। সরকারের দৈনন্দিন লেনদেনের কারণে এর স্থিতি বাড়ে-কমে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় ওই হিসাবে স্থিতি ছিল ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি। বর্তমানে ১১ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এটি স্বাভাবিক লেনদেন এবং অস্থায়ী ওভারড্রাফট। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ভুল খবর দেশের ক্রেডিট রেটিং এবং বেসরকারি খাতের ব্যয় বাড়াতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশে সতর্কতা প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানান, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে শিগগিরই প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হবে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে জোরালো পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ বিষয়ে সরকার এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তিনি বলেন, এটি একটি সময়সাপেক্ষ কাজ। ভবিষ্যতে এই ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনিকরণ বা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
বাজেটে অগ্রাধিকার পাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
অর্থমন্ত্রী বলেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, শিক্ষায় প্রবেশাধিকার এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। মানুষের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসএমই ও স্টার্টআপ খাত কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড। গ্রামীণ কুটিরশিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূলধারায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং সহায়তার মাধ্যমে পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াবে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি বেসরকারি খাতকে চাপে রেখেছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না এবং কর্মসংস্থান কমেছে। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো কঠিন। ব্যবসার অবস্থার উন্নতি না হলে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, এনবিআরকে দুই ভাগ করার বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির সুপারিশ পেলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে ডিরেগুলেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। শ্রমিক দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। বাজারের কার্যক্রম আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; বাজারকে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে পরিচালিত করতে হবে।
ভ্যাট ফাঁকি রোধ এবং করের ভিত্তি বাড়াতে সব পণ্যে কিউআর কোড বা আধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা জানান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তামাকজাত পণ্য, বোতলজাত পানীয়সহ একাধিক পণ্যে কিউআর কোড বসানোর চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। অনুষ্ঠানে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সচিব নাজমা মোবারেকসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
ইআরএফের প্রস্তাবনা ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সংগঠনের বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে
শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট
নয়। বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা, চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং নিত্যপণ্যে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, শিল্প পুনরুজ্জীবন এবং উদ্যোক্তাদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
- বিষয় :
- টাকা
- অর্থমন্ত্রী
