নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় খালাস পাচ্ছেন ৭০% আসামি
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:৫০ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ১১:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রায় ১০ শতাংশ মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা বিচার প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার অডিটোরিয়ামে ‘ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে প্রক্রিয়াগত প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত জানিয়ে তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে হলে আমাদের মানসিকতা, কাঠামো ও সক্ষমতা– এই তিনটি ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রয়োজন।
আইনমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ তুলনামূলক কম, প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা। সেখানে শুধু বিটিভির জন্য বরাদ্দ প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা; যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দও এর চেয়ে বেশি। এই বরাদ্দ দিয়ে বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামো পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, বাজেট আলোচনায় নানা স্তরের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেয়। এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।
গবেষণার তথ্য প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আলোচনায় বিভিন্ন সমস্যা উঠে এসেছে, পরিসংখ্যান এসেছে, বাস্তব চিত্র এসেছে। এসবের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও আইন প্রশাসনের সক্ষমতা। তিনি বলেন, মামলার জট কমাতে সরকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে মধ্যস্থতা কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে নতুন মামলা দায়েরের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি মামলার মধ্যে প্রায় তিন লাখ মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিচারাধীন রয়েছে। বিচারকের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
গবেষণায় যা উঠে এলো
পরামর্শ সভায় গবেষণার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম। ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলপ) কর্মসূচির উদ্যোগে এ পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়।
গবেষণার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে উম্মে কুলসুম বলেন, গবেষণায় দেশের ৩২টি জেলার ৪৬টি ট্রাইব্যুনালে গত বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া চার হাজার ৪০টি মামলার সময়সীমা, মুলতবি সংখ্যা, সময় আবেদনের পুনরাবৃত্তি, মামলার ধরন, সাক্ষী ও অভিযুক্তের তথ্য, ফরেনসিক পরীক্ষা ও রায়ের ধরন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘন ঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণব্যবস্থা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব। গবেষণায় বলা হয়, এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু সময়সীমা কমিয়ে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না। গবেষণায় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা। সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব। তিনি বলেন, প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন।
অনুষ্ঠানের বাইরে যা বললেন আইনমন্ত্রী
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিপ্রায়ে দীর্ঘ ১০ বছর পর আলোচিত তনু হত্যা মামলার তদন্তে জট খুলতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে একজন আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে মামলার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। বিষয়টি বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত হিসেবে বিবেচিত হলেও আইন মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে হাইকোর্টের এক বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এই বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের না। কারণ, এটা সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের বিষয়ে যদি মিসকন্ডাক্টের অভিযোগ আসে, সেটা সুপ্রিম জুডিশিয়ারি কাউন্সিল দেখবে।
- বিষয় :
- নারী ও শিশু নির্যাতন
