জন্মজয়ন্তী
কোক টাউন, অসমাপ্ত রেনেসাঁ, রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হামিম কামাল
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ | ০৯:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটা যুগ আমরা অতিক্রম করে এসেছি। সে যুগে যাত্রাপথে অনেক জাতের মানুষের সাংস্কৃতিক সংস্পর্শ অনিবার্য ছিল। যাতায়াতের পথ ছিল কঠিন। কঠিনের ক্লেশ ছিল, উপহারও ছিল। আমরা ক্লেশ কমিয়েছি, উপহার হারিয়েছি। দশ শহরের জল-হাওয়ায় খাপ খাইয়ে, দশ বণিকের পণ্যগ্রাহী হয়ে, দশ যাজকের আলাপে সঙ্গী হয়ে, দশ পৃথিবীর নারী ও পুরুষের স্নেহ-বিরাগ পেয়ে একেকটি যাত্রা যখন শেষ হতো, তখন যাত্রা শুরু ও শেষের মানুষটি এক থাকতেন না। যারা খোলা মনের মানুষ, তাদের হৃদয়ে তখন মানবজাতির বিচিত্রতা ও বিপরীতে-ঐক্যের জায়গাগুলো ধরা পড়ে গেছে এবং একটা বিপুলা মানব-সমাজ ও অভিন্ন-হৃদয় পরিবার তারা আবিষ্কার করেছেন। সদ্য তরুণ রবীন্দ্রনাথ যখন অক্সফোর্ড যাত্রা করেছেন, তখন জাহাজে, নৌকায়, পদব্রজে, রেলে আরও দশ দেশের মানুষের সঙ্গে সাগর-পাহাড়-প্রান্তর পেরোনোর সময় যে পুরুষের ভেতর তাঁর বাবাকে বা বড় ভাইকে দেখেছেন; যে নারীর ভেতর মাকে দেখেছেন বা অনাগতা প্রেয়সীকে দেখেছেন; যে বৃদ্ধের ভেতর দেখেছেন তাঁর স্বপ্নজগতের কবি ও দার্শনিক বাল্মিকীকে; তারা কেউ এক দেশের মানুষ ছিল না। এখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিস্টোপিয়ার কোক টাউন তৈরি হয়; এবং তার উপযোগী মানুষ। তখন বিশ্বমানব তৈরি হতো। সেই প্রথম যাত্রাকালেই রবির মনে বিশ্বমানব হয়ে ওঠার ডাক এসেছিল। সেই ডাক ছিল সুপ্ত।
রবীন্দ্রনাথকে ক্রমশ ‘রবীন্দ্রনাথ’ করে তুলেছে তাঁর বহুজাতিক মেলামেশা, নিরন্তর ভ্রমণ, সংস্পর্শে আসা, মিত্রতা তৈরির গুণ। আজকের নাগরিকদের যে শক্তির জায়গা, সেটা সম্মিলিত আর্থিক পুঁজির। তখন মানুষের যে ঐক্যের জায়গা ছিল, তা মূলত সাংস্কৃতিক (সংস্কৃতি বা সম্যক কৃতির আওতায় তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পড়ে)। আত্মিক ও আর্থিক মুক্তি ঘটেনি এমন কোনো জাতির গড় সদস্যের পক্ষে বিশ্বমানব হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি বোঝা কঠিন। একজন বিশ্বমানব যখন বৈশ্বিক সংস্কৃতির রক্তসংবহনতন্ত্র তৈরি করেছেন, তখন রক্তসঞ্চালন বজায় রাখতে রণে ও রুচিতে কেন বহুত্ববাদের আদর্শকে আশ্রয় করছেন, তা বোঝা দুরূহ। সেটা রবীন্দ্রনাথের প্রতি বর্তমানের আমাদের গড় মূল্যায়ন দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না। ই এম ফর্স্টারকেই যেখানে গড় ইংরেজদের বুঝতে কষ্ট হয়েছিল; ‘প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ পড়তে পড়তে তাদের জাহাজ যখন ভারত সীমান্ত স্পর্শ করত, তখন বইটিকেও তারা সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দিত। তাদের চেয়ে কালে পিছিয়ে থাকা আমাদের সমাজে, সময়ে রবির পরিণতি আর কী-ই বা হতে পারে! যুগে যুগে তাঁর প্রতি অসম্মান ছুড়ে দিতে অর্বাচীনরা প্রস্তুত।
যে যুগ বড়মাপের খলনায়ক তৈরি করে, সেই যুগ মহানায়ক তৈরি করে। আদি ঔপনিবেশিক যুগ ছিল বড় খলনায়ক নির্মাণের যুগ। পৃথিবী বিশ্বযুদ্ধে যার মূল্য পরিশোধ করেছে। যুগের প্রয়োজনে মহানায়করাও তৈরি হয়েছেন। তারা সময়ের ক্ষয় প্রশমিত করতে চেয়েছেন; ভবিষ্যতের সাম্য বিধান করার ইশতেহার দিয়ে গেছেন। পৃথিবীর বহু জাতির ভেতর ক্রমিক রেনেসাঁকাল তার সাক্ষী। রবির উত্থানকাল বাংলার রেনেসাঁর কাল– একযোগে মহান সমাজ সংস্কারক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, সাহিত্যিক, মহৎ শিল্পপতিদের আবির্ভাব ঘটেছিল। তবে বাংলার সেই নবজাগৃতি দাঁড়িয়েছিল ইউরোপীয় নবজাগৃতির গায়ে হেলান দিয়ে। তাই সেই রেনেসাঁ শেষাবধি সুপ্ত অবস্থায় চলে যায়। আসছে দিনে তার সুপ্তি ভাঙবে। নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র আরও একটি আরোহণ ঘটবে। সেদিন বর্তমান বাংলাদেশ ও বাংলা-সম্পৃক্ত অপরাপর জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে সেই অসমাপ্ত রেনেসাঁ সম্পন্ন হবে; আমরা ‘নেশন’ হয়ে উঠব। সেদিন আমাদের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধও সম্পন্ন হবে। নেশন হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রকৃতির ‘এনট্রপি’র বিরুদ্ধে যাত্রা। অন্যসব বিরুদ্ধ যাত্রার মতোই তা প্রকৃতির স্বয়ংক্রিয় নিয়মে ঘটবে না। পথ কেটে তাকে আনতে হবে। মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে; একসঙ্গে থাকা ও লড়ার দৃঢ় স্বাধীন ইচ্ছাকে ধরে রাখার মধ্য দিয়ে। প্রথম রেনেসাঁর পতাকাবাহকরা সেই বিপুলা কর্মকাণ্ডে আমাদের প্রেরণা হবেন। আর সেই পতাকাবাহকদের পুরোধা ব্যক্তি হবেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কর্মসূচি
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে সারাদেশের জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী রবীন্দ্রজয়ন্তী। ছায়ানটের আয়োজনে দুই দিনব্যাপী রবীন্দ্র উৎসব শুরু হবে ছায়ানট মিলনায়তনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থার দুই দিনব্যাপী ৩৭তম জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত উৎসব শুরু হবে সকাল ১০টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে। কণ্ঠশীলনের নবীনবরণ ও রবীন্দ্রজয়ন্তী সকাল সাড়ে ৮টায়, এলিফ্যান্ট রোডের ওয়াহিদুল হক মিলনায়তনে। সকাল ১০টায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে। রবীন্দ্র-পুরস্কার ২০২৬ প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে বিকেল ৩টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে।
- বিষয় :
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
