জন্মজয়ন্তী
গান, কবিতা, নৃত্যে রবীন্দ্রস্মরণ
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। গতকাল শুক্রবার শিল্পকলা একাডেমিতে -সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৯:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে এ বছর দেশজুড়ে যে সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হয়েছে, তা কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি পরিণত হয়েছে এক বিস্তৃত বৌদ্ধিক ও মানবিক সংলাপে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণ– সব জায়গায় একই দিনে রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে পাঠ, পুনর্চিন্তা ও পুনর্ব্যাখ্যার প্রয়াস দেখা গেছে। গান, কবিতা, নৃত্য, আলোচনা ও স্মৃতিচারণার মাধ্যমে দিনভর তৈরি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক আবহ, যেখানে রবীন্দ্রনাথের দর্শন সমকালীন বিশ্ববাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে।
ছায়ানটে ছিল দুই দিনব্যাপী ‘রবীন্দ্র উৎসব ১৪৩৩’, যা শুরু হয় ছায়ানট মিলনায়তনে সমবেত নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে। প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়, যা মিলনায়তনে এক ধরনের নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। উদ্বোধনী বক্তব্যে ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, রবীন্দ্রনাথ কেবল সাহিত্যিক নন, তিনি মানবতার পক্ষে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।
উৎসবের মূল পর্ব ‘কেন এ হিংসাদ্বেষ’ পরিবেশনায় বর্তমান বিশ্বের সংঘাত, সহিংসতা ও বিভাজনের বাস্তবতাকে গান, কবিতা ও নৃত্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও দর্শনকে কেন্দ্র করে শান্তি ও মানবতার আহ্বান ধ্বনিত হয়। দ্বিতীয় পর্ব ‘সুরের ধারা’য় একাধিক রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশিত হয়, যেখানে বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীরা অংশ নেন।
শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় আয়োজন
রাজধানীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী। শুরুতে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, যেখানে দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা অংশ নেন। বক্তারা রবীন্দ্রনাথকে বাঙালি জাতিসত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং মানবিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অভিহিত করেন।
আলোচনা শেষে সমবেত সংগীত দিয়ে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। এ পর্বে পরিবেশিত হয় ‘হে নূতন’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’, ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা’ এবং ‘ঐ মহামানব আসে’সহ বহু কালজয়ী রবীন্দ্রসংগীত। একক ও সমবেত পরিবেশনায় শিল্পীরা রবীন্দ্রসৃষ্টিকে নতুন অভিব্যক্তিতে উপস্থাপন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উৎসব
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা আয়োজন করে দুই দিনব্যাপী সপ্তত্রিংশ জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত উৎসব। ‘রথের চাকার রবে জাগাও জাগাও সবে’ স্লোগানে আয়োজিত উৎসবটি উৎসর্গ করা হয় প্রয়াত শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের। পরে একক ও সম্মিলিত পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করা হয়। বিকেলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী পর্বে অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক প্রধান অতিথি ছিলেন। এতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পী তিমির নন্দীকে ‘কলিম শরাফী’ পুরস্কার দেওয়া হয়।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সমকালীন পাঠ
বাংলামটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘রবীন্দ্রনাথ ও আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনায় রবীন্দ্রনাথকে সমকালীন সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। গবেষক রাজীব সরকার তাঁর প্রবন্ধে বলেন, উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ আজও এক অনন্য আশ্রয়।
শিক্ষক ড. নীলিমা তাবাসসুম বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার গভীরে প্রোথিত। অন্যদিকে গবেষক খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার মন্তব্য করেন, রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়ার যে কোনো চেষ্টা ইতিহাসে বিভাজন ও সংকীর্ণতার জন্ম দিয়েছে।
রাজধানীর বাইরে উদযাপন
ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জেলায় রবীন্দ্রজয়ন্তী ছিল সমানভাবে প্রাণবন্ত। কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহের কুঠিবাড়ীতে তিন দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গতকাল বিকেলে এর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের সূর্যকিরণ। সূর্য যেমন আলো দিয়ে অন্ধকার দূর করে, রবীন্দ্রনাথও বাংলা সাহিত্যে একই রকম।’
নওগাঁর পতিসরে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ এখানে যখন আসতেন, তখন কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে ব্যথিত হতেন। তিনি শুধু কবি ছিলেন না, সমাজ সংস্কারকও ছিলেন।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ঐতিহাসিক রবীন্দ্র কাছারিবাড়িতে তিন দিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন করা হয়, যেখানে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি আজও বাঙালির জীবন্ত অনুভব, যা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বগুড়ায় ‘আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী’ ও ‘ঋদ্ধ সৃজন’-এর উদ্যোগে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে রবীন্দ্রনাথের ব্রিটিশবিরোধী অবস্থান ও তাঁর মানবিক দর্শন নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া দেশের নানা প্রান্তে কবিগুরুকে স্মরণ করা হয়।
[তথ্য দিয়েছেন নওগাঁ ও রাণীনগর, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) ও কুমারখালীসহ (কুষ্টিয়া) বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা]
- বিষয় :
- রবীন্দ্রসংগীত
