ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এলডিসি উত্তরণের চাপে ওষুধ শিল্প

গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ালে টিকতে কঠিন হবে দামের প্রতিযোগিতায়

গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ালে টিকতে কঠিন হবে দামের প্রতিযোগিতায়
×

ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ১৮:০৮ | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ | ১৮:২৪

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বর্তমানের পেটেন্ট ছাড় সুবিধা শেষ হলে আন্তর্জাতিক কোম্পানির লাইসেন্স ছাড়া অনেক ওষুধ উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, বেড়ে যেতে পারে ওষুধের দামও।

বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব বিষয় উঠে আসে। ‘এলডিসি উত্তরণ প্রেক্ষাপটে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উদ্ভাবন শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট। 

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কোম্পানির লাইসেন্স ছাড়াই অনেক জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করতে পারছে। ফলে উৎপাদন খরচ কম থাকায় তুলনামূলক কম দামে ওষুধ বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এলডিসি সুবিধা শেষ হলে নতুন পেটেন্টধারী ওষুধ উৎপাদনে লাইসেন্স নিতে হবে এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স অনুসরণ বাধ্যতামূলক হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে বায়োইকুইভ্যালেন্স ও বায়োসিমিলার পরীক্ষার মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানির এখনো সেই সক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে বিদেশে পরীক্ষা করাতে হলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ক্যানসারসহ জটিল রোগের ওষুধে। ফলে এসব ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

কর্মশালায় ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অধ্যাপক হামিদ বলেন, ‘২০১৮ সালের এপিআই নীতিমালায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় গড়ে ওঠা এপিআই শিল্পপার্কও এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যাচিউরিটি লেভেল–৩ অর্জনেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।’

বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআইএমএ) সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান বলেন, ‘২০১৬ সালে এডিবির অধীনে এ বিষয়ে একটি গবেষণা হয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে নীতিমালাও করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নে অগ্রগতি খুবই সীমিত। তাঁর মতে, নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া এই শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘এলডিসি সুবিধা হারালে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়বে। বিশেষ করে পেটেন্ট ছাড়, কমপ্লায়েন্স ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের বাধ্যবাধকতার কারণে ওষুধের দাম বাড়তে পারে এবং রপ্তানি সক্ষমতা কমে যেতে পারে।’

তবে তিনি মনে করেন, গবেষণা ও উন্নয়ন, বায়োটেকনোলজি এবং এপিআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে প্রভাবমুক্ত রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। 

ড. তিতুমীর বলেন, ‘ওষুধ শিল্পকে প্রাইস টেকার হতে হবে, প্রাইস মেকার নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে গবেষণা ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং শিল্পের বহুমুখীকরণ জরুরি।’

কর্মশালার বক্তারা বলেন, শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, গবেষণা তহবিল গঠন, বায়োটেকনোলজি, ভ্যাকসিন ও নিউক্লিয়ার মেডিসিন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারবে।

আরও পড়ুন

×