ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গভর্নরের সংবাদ সম্মেলন

বন্ধ কারখানা খুলতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

বন্ধ কারখানা খুলতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল
×

ছবি: সমকাল ইপেপার

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১০:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বন্ধ কারখানা চালু, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা দিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এই তহবিলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

গত ফেব্রুয়ারিতে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এলেন তিনি। অনুষ্ঠানে ব্যাংকের চার ডেপুটি গভর্নর ও একাধিক নির্বাহী পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গভর্নর বলেন, ‘বেসরকারি খাতের বর্তমান বাস্তবতায় এ রকম তহবিল ঘোষণার চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প ছিল না। তবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় আছে, থাকবে। সামনে এমন অনেক আইন আসবে, যার ফলে ঋণখেলাপি হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি বাড়ানো আমাদের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো হবে।’

গভর্নর বলেন, এই বিশেষ তহবিলের কারণে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হবে না। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরিরও শঙ্কা নেই। তিনি বলেন, এটা ব্যাংকিং খাতেরই টাকা। যেসব ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্য আছে, সেখান থেকে নিয়ে যাদের সমস্যা রয়েছে, তাদের দেওয়া হবে। এখানে সরকার কেবল ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। এর বাইরে কিছু দিচ্ছে না। ফলে তহবিল বিতরণ ও আদায়ের দায়িত্ব ব্যাংকের ওপর। ব্যাংক যখন নিশ্চিত হবে– এই গ্রাহক ভালো, কেবল সেখানেই ঋণ দেবে। এ ছাড়া ব্যাংকেরই টাকা হওয়ায় অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর বিষয় নেই। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়নের কারণেও বাজারের ওপর চাপ পড়বে না।

নতুন তহবিল গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গভর্নর বলেন, ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। শিল্প খাতে আমাদের কিছু ব্যাঘাত ঘটেছে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। অনেক অর্থ পাচার হয়ে গেছে। আমানতকারীর আস্থা অনেকখানি কমে গিয়েছিল। উচ্চ সুদহারের কারণে এসএমই উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছিল। যাকেই শুনবেন, বলবে তহবিল সংকট রয়েছে। এ রকম প্রেক্ষাপটে এই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিল্পের পুনর্জাগরণ, সবুজ অর্থায়ন, রপ্তানি ও কৃষি উৎপাদন বাড়ানোই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য। আবার রেমিট্যান্সও আরও বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থা ফিরে আসবে। সব মিলিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে।’

পাঁচ লাখ কোটি টাকা চুরি গেছে
গভর্নর বলেন, ‘ব্যাংক খাত থেকে পাঁচ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। ভদ্রভাবে এটাকে খেলাপি বলা হচ্ছে। আসলে এটা খেলাপি না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ঋণের বিপরীতে জামানত নেই, যথাযথ নথি নেই। আর চুরির এসব অর্থ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাচার হয়ে গেছে। এসব অর্থ ফেরত আনা অনেক জটিল ও সময়সাপেক্ষ। যদিও অর্থ ফেরত আনতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমরা খুব এটা নিয়ে কাজ করছি।’

তিনি বলেন, আগামীতে যেন ইচ্ছাকৃত খেলাপি না হয়, সে জন্য অনেক আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি খোলার জন্য আইন করা হচ্ছে। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মানি লোন কোট আইনের সংশোধন করা হচ্ছে। একটা গ্রুপ অনেক টাকা নিয়ে যাবে, সেটা আর হবে না।

কোন খাতে কত তহবিল
কোন খাতের জন্য কত টাকার তহবিল বরাদ্দ থাকছে, সেই তথ্য তুলে ধরেন গভর্নর। তিনি জানান, প্রণোদনা প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করবে। উভয় ক্ষেত্রে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। গ্রাহক পর্যায়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে।

তিনি জানান, ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মধ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল করা হচ্ছে। শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানি, রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ইউটিলিটি বিল ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে অর্থায়ন করা হবে। সিএমএসএমই খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়া হবে কাঁচামাল ক্রয় ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল রাখা হয়েছে। আর রপ্তানি বহুমুখীকরণে তিন হাজার কোটি টাকা, উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। 

গভর্নর জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল দেবে। সরকারের গ্যারান্টির বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে এ অর্থ দেওয়া হবে। পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মধ্যে রপ্তানি খাতের জন্য প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিটে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে। কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে দুই হাজার কোটি টাকা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে এক হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন করা হবে। এ ছাড়া গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত মাছ ও মাছ রপ্তানি খাতে দুই হাজার কোটি টাকার তহবিল হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন বিনিয়োগে এক হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য এক হাজার কোটি টাকা, স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা থাকছে। বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোগে এরই মধ্যে স্টার্টআপ কোম্পানির নামে আলাদা একটি কোম্পানির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এখান থেকে ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের আশা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল দেওয়া হবে। এই অর্থ আর ফেরত নেওয়া হবে না। সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য এই ৫০০ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে খরচ করা হবে। খেলা, নাটক, হস্তশিল্প, পেইন্টিংয়ের মতো যে কোনো সৃজনশীল কাজে এখান থেকে অর্থ দেওয়া হবে।

তহবিলের অপব্যবহার নয়
গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে আসার পর নন-ফান্ডেড ঋণ সুবিধা দ্বিগুণ করাসহ ব্যবসায়ীদের নানা সুবিধা দেওয়া নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার দাম ৪০ শতাংশের মতো বেড়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামও বেড়ে গেছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতার আলোকে কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে না। এ কারণে ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে। তবে ঋণসীমা বাড়ানো মানেই ঋণ দিয়ে দেওয়া না। ব্যাংক বিচার-বিশ্লেষণ করে ভালো গ্রাহককে ঋণ দেবে।

করোনা মহামারির সময় দেওয়া প্রণোদনা তহবিলের বড় অংশেরই অপব্যবহার হয়েছে। এবার অপব্যবহার হলে কী হবে– এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, করোনার প্রণোদনা তহবিলের অপব্যবহার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। ফলে এসব তহবিলের সার্কুলার যখন হবে, অপব্যবহার যেন না হয়, সে বিষয়ে বিভিন্ন নীতি নেওয়া হবে। আগের মতো একটা গ্রুপের বেশি টাকা নেওয়ার সুযোগ হয়তো থাকবে না। তিনি বলেন, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে এসব তহবিলের নকশা করা হয়েছে। ফলে অতীতের মতো খারাপ অবস্থা হবে না।

২০২০ সালে করোনা মহামারির প্রভাব শুরুর পর সরকারের সুদ ভর্তুকির আওতায় তখন এক লাখ কোটি টাকার বেশি বিশেষ তহবিল ঘোষণা করে সরকার। কম সুদের ওই তহবিলের বড় অংশই সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা নিয়ে পুরোনো ঋণ সমন্বয়, অন্য খাতে ব্যবহার, বিদেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন

×