হাম ও হামের উপসর্গ
টিকাদানের দুই মাস পরও কমছে না সংক্রমণ
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
হামের উপসর্গে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০১ জনে। একই সময়ে নতুন করে এক হাজার ২১০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি শুরুর দুই মাস পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে না কমা উদ্বেগের বিষয়। প্রতিদিনই এক হাজারের বেশি নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, কমে আবার বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও।
বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক
নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, মারা যাওয়া সাতজনের মধ্যে ছয়জন ঢাকা বিভাগের এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫১১ জন। একই সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও এক হাজার ২১০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭৪ হাজার ৫৭২ জন। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ১৯১। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬০ হাজার ১৫৮ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৫৫ হাজার ৯৪২ জন।
আক্রান্ত ৬ জনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক
হামের সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে। এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিয়েছে ছয় হাজার ৯৩৪ রোগী। মারা গেছে ৪১ জন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ৩২৮ জন।
হাসপাতালটিতে ভর্তি হওয়া পাঁচ হাজার ৮১১ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চিকিৎসা নেওয়া প্রতি ছয় রোগীর একজনের বয়স ১৫ বছরের বেশি। অর্থাৎ, হামের সংক্রমণ শুধু শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাপ্তবয়স্কও আক্রান্ত হচ্ছেন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছয় মাসের কম বয়সী রোগী ছিল ৩৫৯ জন (৬ দশমিক ১৭ শতাংশ), ৭ থেকে ৯ মাস বয়সী ৬৯৪ জন (১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ), ১০ মাস থেকে দুই বছর বয়সী এক হাজার ৪৭১ জন (২৫ দশমিক ৩১ শতাংশ), দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক হাজার ১৯৪ জন (২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ), পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী ৭৬৮ জন (১৩ দশমিক ২১ শতাংশ) এবং ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৪১৭ জন (৭ দশমিক ১৭ শতাংশ)।
অন্যদিকে, ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগী ছিল ৫৮৪ জন (১০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ) এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী রোগী ছিল ৩২৪ জন (৫.৫৭ শতাংশ)। অর্থাৎ, ১৫ বছরের বেশি বয়সী রোগীর সংখ্যা মোট রোগীর প্রায় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা প্রতি ছয়জনে প্রায় একজনের সমান।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, পরিবারের আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো শিশু আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে যথাযথভাবে আইসোলেশনে না রাখলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও দ্রুত সংক্রমিত হতে পারেন।
তিনি বলেন, অনেকের ধারণা, হাম শুধু শিশুদের রোগ। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিত প্রাপ্তবয়স্ক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। যারা শৈশবে টিকা নেননি, পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করেননি, আগে কখনও হামে আক্রান্ত হননি কিংবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ঝুঁকি বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন সমকালকে বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করায় মৃত্যুহার কমছে না। আক্রান্ত শিশুদের শুরুতেই আইসোলেশনে রাখা, মাঝারি পর্যায়ে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিসেবা জোরদার করা জরুরি। শুধু আইসিইউনির্ভর চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যু কমানো যাবে না। রোগের শুরু থেকেই সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আইসোলেশন, অক্সিজেন ও পুষ্টি এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টিকা কার্যক্রম শুরুর দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে না কমার বিষয়ে তিনি বলেন, এতদিনে সংক্রমণ কমে যাওয়ার কথা ছিল। কেন তা হচ্ছে না, বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। যারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেছে, তারা টিকা পেয়েছে। এখন ‘মাইক্রোপ্ল্যান’ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যেসব শিশু এখনও টিকা পায়নি, তাদের আওতায় আনতে হবে।
সংক্রমণ কমে আসার আশা মন্ত্রীর
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামে মৃত্যুর সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে এবং আক্রান্তের সংখ্যাও আর বাড়ছে না। একটি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। আমরা আশা করছি, গত মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে যেসব শিশু টিকা নিয়েছে, তাদের শরীরে এ মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। তখন সংক্রমণ দ্রুত কমে আসবে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং টিকার বাইরে থাকা শিশুদের খুঁজে বের করে কর্মসূচির আওতায় আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
- বিষয় :
- হাম
- হামের উপসর্গ
- মৃত্যু
- টিকা
