‘সুন্দরবন নিয়ে কথা বলার সময় মেলে মাত্র দুই মিনিট’
ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ২১:২২
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী উপকূলীয় ও আদিবাসী নারীরা হলেও নীতি নির্ধারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠস্বর যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালী এলাকায় আয়োজিত এক কমিউনিটি সংলাপে অংশ নেওয়া নারীরা এসব কথা বলেন।
নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘সান্তাল’র উদ্যোগে এবং বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠন ও সায়া (সোশ্যাল অ্যাকশন ফর ইয়ুথ অ্যালায়েন্স-সায়া)-এর সহযোগিতায় জলবায়ু, নারী ও নারী স্বাস্থ্য শীর্ষক এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে বনজীবী নারী, নারী জেলে, নারী কৃষক, বাঘবিধবা নারী এবং মুন্ডা সম্প্রদায়ের নারীরা অংশ নেন। তারা জানান, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানির সংকট, জীবিকার অনিশ্চয়তা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। অনেক নারীকে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মাথায় ও কোমরে ভারী কলস বহন করে পানি আনতে হয়। গর্ভাবস্থাতেও এ কষ্টকর কাজ করতে হওয়ায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে চর্মরোগ, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, মূত্রনালির সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ, পানিশূন্যতা, হাঁটু ও কোমর ব্যথাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। নিরাপদ পানি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অভাবে এসব সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় পুকুর, খাল ও নলকূপের পানি লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় গোসল, রান্না, কাপড় ধোয়া এবং পানীয় জল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সংকট তৈরি হয়েছে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী, কিশোরী, বৃদ্ধা ও অসুস্থ নারীদের ওপর।
সংলাপে বাল্যবিবাহের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি, দারিদ্র্য, দুর্যোগ এবং জীবিকার সংকট অনেক পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য করছে। এর ফলে অল্প বয়সে মাতৃত্ব, অপুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য জটিলতা এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে।
এ সময় এক স্থানীয় নারী নেতা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বলেন, বিভিন্ন বড় বড় সভা, সেমিনার ও কর্মসূচিতে সুন্দরবন নিয়ে কথা বলার সুযোগ দিলে আমাদের বলা হয়— সুন্দরবন নিয়ে কথা বলার সময় মাত্র দুই মিনিট। অথচ সুন্দরবন ও উপকূলকে টিকিয়ে রাখতে যেসব নারী প্রতিদিন লবণাক্ত পানি, ঝড়, নদীভাঙন, জীবিকার অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন, তাদের কষ্টের কোনো সীমা নেই। দুই মিনিটে আমাদের জীবনসংগ্রামের গল্প বলা সম্ভব নয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব যাদের ওপর পড়ে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাদের কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে কম শোনা যায়। উপকূলীয় ও আদিবাসী নারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিষয়টি পরিবর্তনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আয়োজক সংগঠন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অংশীজনদের প্রতি কয়েকটি দাবি তুলে ধরে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবেশ নীতিতে নারীস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, উপকূলীয়, বনজীবী ও আদিবাসী নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, লবণাক্ততা ও জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা উদ্যোগ গ্রহণ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু অর্থায়নে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
বক্তারা বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং উপকূলীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও নেতৃত্বকে কেন্দ্রস্থলে আনতে হবে। তাদের মতে, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকৃত জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
- বিষয় :
- জলবায়ু
- সুন্দরবন
- জলবায়ু পরিবর্তন
