ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সরকারের ১০০ দিন

ঢাকার ওয়াশিংটন-নির্ভরতা অব্যাহত

এগিয়ে নেওয়ার বার্তা থাকলেও অস্বস্তি কাটেনি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে

ঢাকার ওয়াশিংটন-নির্ভরতা অব্যাহত
×

 কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৯:০৫ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৯:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতি ঘটে তাঁর টানা ১৫ বছরের শাসনের। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশেও পালাবদল ঘটে বৈদেশিক প্রভাবের। হাসিনা সরকার নির্ভরশীল ছিল প্রতিবেশী ভারতের ওপর। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই নির্ভরশীলতা পৌঁছায় ওয়াশিংটনে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপিও ওয়াশিংটন-নির্ভরতা অব্যাহত রেখেছে।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল বৈরী। সেই সম্পর্ক ঠিক বিপরীত মোড় নেয় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বিএনপি সরকারও। ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক এখন সবচেয়ে উন্নত। সবচেয়ে সমালোচিত দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি ড. ইউনূসের সময় সই করা হয়েছিল। এ চুক্তি বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সফরের সময় কৌশলগত জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত কিছু সামরিক চুক্তি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর এরই মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পল কাপুর এবং বাণিজ্য দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চের সফর উল্লেখযোগ্য।

চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে বড় পরিবর্তন এসেছে। ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সব ধরনের সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে দেশটি। ইউনূসের উদ্যোগ নেওয়া সংস্কারগুলোকেও সমর্থন দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থ দপ্তরের সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যানের নেতৃত্বে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে ঢাকায় সফরও করে গিয়েছেন। হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের প্রতি ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক সমর্থন বিশ্বকে বোঝাতে এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে সহযোগিতার ঝুলি নিয়ে এগিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিএনপি সরকারের সময়ে শুল্ক চাপের মাধ্যমে নিজ পণ্য বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছে দেশটি। দুই দেশের মধ্যে উড়োজাহাজ প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ৩৭০ কোটি ডলারে ১৪টি বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিসহ অন্যান্য পণ্যও আমদানি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ।

অস্বস্তি কাটেনি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। দিল্লির স্পষ্ট বার্তা ছিল, ঢাকায় নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে। গত ১২ জানুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে কূটনৈতিক দিক থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার স্পষ্ট বার্তা আসে দিল্লি থেকে। বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। উভয় দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি এবং পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও উভয়ের সুবিধার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে বলে বার্তা দেয়। পাশাপাশি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ভারতের কাছে ফেরত চেয়েছে। তবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখনও গতি পায়নি। বাংলাদেশিদের ভিসা আগের মতো স্বাভাবিক হয়নি। নির্বাচনের পরপর ঢাকা সব ভারতীয় নাগরিকের জন্য ভিসা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে সংকটের সময় ভারত থেকে তেল আমদানি করেছে ঢাকা। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কূটনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন বার্তা দেয়। স্বাভাবিক করার চেষ্টা থাকলেও ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে অবিশ্বাস ও অস্বস্তি বিদ্যমান।

সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় বিএনপি
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ২০০৪ সালে ঢাকায় তাইওয়ানের একটি ট্রেড অফিস খোলার ঘোষণা এসেছিল। এই ঘোষণা ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে অস্বস্তিতে ফেলে, তা এখনও বিদ্যমান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকার চীনা রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একাধিক সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। এ ছাড়া চলতি মাসে ঢাকা ও বেইজিংয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও তাইওয়ানের বিষয়টি চীনের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে। বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে তাইওয়ানের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে অতীতের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে ‘এক চীন নীতি’র প্রতি ঢাকার সমর্থনের বার্তা দেওয়া হয়েছে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে।

আগামী জুনের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে যাওয়ার কথা। ঢাকা-বেইজিং এর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সফরকে কেন্দ্র করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন এজেন্সির (সিডকা) ২০০ ইউয়ানের তহবিল, বেশ কিছু প্রকল্প এবং চীনের চার বৈশ্বিক উদ্যোগ এবং পাঁচ নীতিসহ ‘এক চীন নীতি’ গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় চীনকে রেখে ঢাকা-ইসলামাবাদ-বেইজিং অথবা ঢাকা-ইসলামাবাদ-বেইজিং-নেপিদোকে নিয়ে জোটের একটি প্রস্তাব রয়েছে। ঢাকা পরিষ্কারভাবেই বেইজিংয়ের অস্বস্তির কারণ হতে চায় না। তবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কে রাজনৈতিক গভীরতার পরিবর্তে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে তৎপর। কারণ, বৈশ্বিকভাবেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি রয়েছে।

ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়েছে
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। সম্প্রতি ঢাকা ও ব্রাসেলস অংশীদারি সহযোগিতা চুক্তির (পিসিএ) প্রাথমিক সই করে। এর মাধ্যমে দুই পক্ষের সম্পর্ক কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই পক্ষের রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়বে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে সম্পর্কের পরিসর বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর নতুন করে ইইউ-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ব্রাসেলসে ওই অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন উপস্থিত ছিলেন। এরপর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এ চুক্তির দরকষাকষি এগিয়ে নেয় এবং চূড়ান্ত করে। আর বিএনপি সরকার এ চুক্তির প্রাথমিক সই করে। তবে ঢাকা উড়োজাহাজ প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস থেকে বিমান ক্রয় না করা নিয়ে ইউরোপের অসন্তোষ রয়েছে। ইতোমধ্যে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন ইইউর সদস্য রাষ্ট্রের ঢাকার রাষ্ট্রদূতরা। তবে ইউরোপের আরেক দেশ যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ আমলে সেখানে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে।

আরও পড়ুন

×