১০ হাজার কমিউনিটি প্যারামেডিককে স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করার আহ্বান
আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ | ১২:২৬ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ | ১২:৪৫
দেশে স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবলের সংকট নিরসন এবং প্রান্তিক পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১০ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত কমিউনিটি প্যারামেডিককে (সিপি) সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূলধারায় যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নতুন করে পথ খোঁজার প্রয়োজন নেই। বরং ইতোমধ্যে তৈরি হওয়া এই বিশাল দক্ষ জনবলকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে কাজে লাগানোই হবে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ফার্স হোটেলে সুইস কন্ট্যাক্ট বাংলাদেশ-এর ‘আস্থা’ প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পলিসি ডায়ালগ অন কানেকটিং কমিউনিটিজ টু দ্য হেলথ সিস্টেম: দ্য রোল অব কমিউনিটি প্যারামেডিকস’ শীর্ষক আলোচনা সভায় নীতিনির্ধারক, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর সহযোগিতায় এ সভার আয়োজন করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য গড়ে ৪৪.৫ জন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে আছে গড়ে মাত্র ৭.৩ জন। গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও ভয়াবহ, যেখানে প্রায় ৩২ শতাংশ সেবাদাতা কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা আনুষ্ঠানিক যোগ্যতা ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের (বিএনএমসি) অধীনে দুই বছর মেয়াদি ‘কমিউনিটি প্যারামেডিক’ প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয়। বর্তমানে দেশজুড়ে ৫৬টি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পেয়ে ১০ হাজারের বেশি সিপি মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। কিন্তু সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব ও সরকারি কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবে তাদের বিশাল সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গর্ভস্থ শিশুর হৃৎস্পন্দন পরীক্ষায় কমিউনিটি প্যারামেডিকদের সফলতার হার ৭৩ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে সাধারণ সেবাদাতার হার মাত্র ৩৬ শতাংশ। একইভাবে, গর্ভধারণ পরীক্ষায় প্যারামেডিকরা ৮১ শতাংশ (অন্যরা ৪৬ শতাংশ), এবং রক্ত পরীক্ষায় ৫৭ শতাংশ (অন্যরা ৩৩ শতাংশ) সফল। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, সংকটাপন্ন রোগীকে সঠিক সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানোর (রেফারেল) ক্ষেত্রে প্যারামেডিকদের সাফল্যের হার ৯৪ শতাংশ।
এই দক্ষ সেবার ফলে গ্রামীণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমেছে এবং সঠিক সময়ে সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা বেড়েছে। আস্থা প্রকল্পের টিম লিডার আবদুল আউয়াল আলোচনার সূত্রপাত করে বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে কমিউনিটি প্যারামেডিক তৈরিতে যে বিনিয়োগ হয়েছে, তার সুফল এখন দৃশ্যমান। তাদের এখন সরকারি স্বীকৃতি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনার সময় এসেছে।’
কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. আবু মুহাম্মদ জাকির হুসাইন বলেন, ‘প্যারামেডিকরা গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং সরকারি হাসপাতালের মাঝে একটি শক্তিশালী সেতু হিসেবে কাজ করছেন। তাদের সরকারি কাঠামোয় সরাসরি যুক্ত করা গেলে রেফারেল ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।’
ব্র্যাকের অধ্যাপক ডা. কাওসার আফসানা একটি প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, ‘সরকার ভবিষ্যতে যে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই ১০ হাজার প্রশিক্ষিত সিপিকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এটি মাতৃ ও শিশুমৃত্যুহার কমানোর লক্ষ্যমাত্রায় সরাসরি ভূমিকা রাখবে।’
