ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সিটি গ্রুপের ব্যবসায়িক পুনর্গঠন হচ্ছে

সিটি গ্রুপের ব্যবসায়িক পুনর্গঠন হচ্ছে
×

ছবি: সমকাল ইপেপার

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অন্যতম শীর্ষ ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক সিটি গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে সংকটে পড়েছে। সংকট কাটিয়ে সিটি গ্রুপ যাতে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেজন্য ব্যাংকগুলো তাদের সময় দিতে চায়। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ঋণ পুনর্গঠনের জন্য সময় চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও চায় সিটি গ্রুপ যেন ব্যবসা টিকিয়ে রেখে ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে পারে। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ঋণ যাতে খেলাপি না করে, তার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। পাওনাদার ব্যাংকগুলো যৌথভাবে গ্রুপটিকে সংকট থেকে বের করতে কাজ করছে। 

সিটি গ্রুপের ভোগ্যপণ্য ছাড়াও ইস্পাত, শিপিং, চাসহ গণমাধ্যমেও বিনিয়োগ রয়েছে। তারা তীর, বেঙ্গল, ন্যাচারাল, জীবন, কুইক বাইট ও জেলফি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করে। ১৯৭২ সালে কার্যক্রম শুরু করা সিটি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে– সিটি এডিবল অয়েল, সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি অয়েল মিলস, সিটি সিড ক্রুজিং ইন্ডাস্ট্রি, সিটি সিড ক্রুজিং ইন্ডাস্ট্রি (ইউনিট-২), সিটি অর্থনৈতিক অঞ্চল, সিটি অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস, সিটি টি এস্টেট, সিটি পলিমার, সিএসআই পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি, ভোট অয়েল রিফাইনারিজ, শম্পা ফ্লাওয়ার মিলস, পূর্বগাঁও অর্থনৈতিক অঞ্চল, রূপসী ফিড মিলস লিমিটেড, রূপসী ফুডস, রূপসী ফ্লাওয়ার মিলস, রূপসী সিড ক্রাশিং লিমিটেড, সিটি এলপিজি, ঢাকা সুগার মিল, ইউকে বাংলা পেপার মিল, হোসেন্দী শিপ বিল্ডিং, ঢাকা সল্ট অ্যান্ড কেমিক্যালস ও খান ব্রাদার্স শিপ বিল্ডিং লিমিটেড।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিটি গ্রুপে দেশি-বিদেশি মোট ৪৭ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। ঋণের অর্ধেকের বেশি রয়েছে ১০ ব্যাংকে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকার পাওনা রয়েছে এইচএসবিসির। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। পর্যায়ক্রমে শীর্ষ পাওনাদারের তালিকায় রয়েছে– সিটি, ইউসিবি, ইস্টার্ন, পূবালী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, প্রাইম, ব্র্যাক ও ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক। সিটি গ্রুপের বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ তিন হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ পেয়েছে মূলত এডিবি, আইএফসি, আইসিডি, প্রাইম ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং এইচএসবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে।

জানা গেছে, ঋণ সংকট কাটাতে সিটি গ্রুপ তাদের সবচেয়ে বড় আর্থিক বোঝা হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কয়েকটি কারখানা বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২২ সালে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানা উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। তবে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় সম্ভব হয়নি। অর্থনৈতিক অঞ্চলের পুরোটা বা আংশিক বিক্রির টাকায় ঋণ কমিয়ে আনা হবে। এ ছাড়া গ্রুপটির মালিকানাধীন ১৮ হাজার ৮৭৫ একর আয়তনের আটটি চা বাগান রয়েছে। তারা ‘বেঙ্গল’ ব্র্যান্ডের চা উৎপাদন করে। কয়েকটি চা বাগান বিক্রি করে দিতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠান ‘আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং’কে দিয়ে এরই মধ্যে একটি ব্যবসায়িক পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করিয়েছে। সেই আলোকে পুনর্গঠন করতে যাচ্ছে।

বিশেষ নীতি সহায়তার আওতায় জনস্বার্থে সিটি গ্রুপের ঋণখেলাপি না করা, সুদের হার কমানো, ১ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন সুবিধা চেয়ে গত ৩১ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেয় সিটি গ্রুপ। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে গভর্নরের সঙ্গে সিটি গ্রুপের নীতিনির্ধারকরা বৈঠক করেছেন। ব্যাংকগুলোও নিজেরা বৈঠক করে একটি কমিটি করেছে। গত ২২ জুন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে সিটি গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করা হয়। এর পর বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে ব্যাংকগুলোকে জানিয়েছে, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ঋণ বর্তমান মানে বহাল রাখা যাবে। তবে শ্রেণীমান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রভিশন নিশ্চিত করতে হবে। আর প্রকৃত আদায় ছাড়া আয় খাতে সুদ নেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ৩০ জুন মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে বলেন, সিটি গ্রুপের সংকটের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। শুধু বিনিয়োগ সংকটের কারণে এখনকার পরিস্থিতি হয়নি। ব্যাংকগুলো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে হয়তো একটা সমাধান আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি না করার বিষয়ে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। এর বাইরে অন্য ক্ষেত্রে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হবে না। তবে ব্যাংক সুদহার কমাতে চাইলে সেই সুযোগ রয়েছে। আবার গত ২৯ জুনের এক্সিট নীতিমালার আলোকে এই গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠানের পুরো দায় একবারে পরিশোধ করলে, সুদ মওকুফ করতে পারবে।

সম্পদ বিক্রির আলোচনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে একটি কমিটি হয়েছে। এরই মধ্যে সিটি গ্রুপের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে তারা। গ্রুপটির সবচেয়ে বড় ঋণের বোঝা থাকা হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কয়েকটি কারখানা বিক্রির আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিটি গ্রুপের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। গ্রুপের মালিকানাধীন একটি টিভি চ্যানেলও বিক্রির আলোচনায় রয়েছে। 

বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, সিটি গ্রুপ আগে কখনও ঋণ নিয়ে সমস্যায় পড়েনি। অর্থ পাচার বা জালিয়াতির কোনো অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে শোনা যায়নি। তবে তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিপুল অঙ্কের টাকা আটকে যাওয়া এবং করোনার পর বিনিময়হারজনিত লোকসানসহ বিভিন্ন কারণে সমস্যায় পড়েছে। হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানা করতে পারলে ঋণের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সমন্বয় হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

সংকট উত্তরণে ব্যাংকগুলোর যৌথ উদ্যোগ 
বাংলাদেশ ব্যাংকে এবিবির চিঠিতে বলা হয়, সিটি গ্রুপ দেশের অন্যতম একটি শীর্ষস্থানীয় ও স্বনামধন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রুপটির রয়েছে ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবসায়িক নেতৃত্ব। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে গ্রুপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যার মূল ভিত্তি হলো তাদের ফ্ল্যাগশিপ গৃহস্থালি ব্র্যান্ড ‘তীর’। সিটি গ্রুপ দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি কয়েকটি খাতে বড় বাজার অংশীদারিত্ব রয়েছে তাদের। প্রায় ৪০টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত গ্রুপটিতে সরাসরি ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে ৩৬টি ব্যাংকের শীর্ষ স্তরের গ্রাহক হিসেবে তাদের ব্যাপক সুনাম রয়েছে। করোনা মহামারির পর থেকে গ্রুপটি কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি অন্যতম। আবার টাকার ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের ফলে বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় লোকসান হয়েছে।

এবিবি জানিয়েছে, কর অবকাশসহ সরকারি প্রণোদনার সুবিধা নিতে গ্রুপটি মুন্সীগঞ্জের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি শিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠা করে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগে দেরির কারণে সেখানকার ছয়টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। অথচ যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণের কিস্তি পরিশোধ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বকেয়া স্থিতির কারণে কিছু ব্যাংক বর্তমান সীমার আওতায় ঋণ সুবিধা বন্ধ করেছে। আবার সংকটে থাকা ব্যাংক ঋণ সীমা কমিয়ে দিয়েছে। গ্রুপটির পরিস্থিতিকে যা আরও জটিল করে তুলেছে। গ্রুপটিকে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলেছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিটি গ্রুপের বর্তমানে ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। ঋণের বড় অংশই বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং নতুন কাঁচামাল আমদানির সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়েছে। বাজারে সিটি গ্রুপের পণ্যের চাহিদা অত্যন্ত জোরালো থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের সীমা সংকুচিত হয়ে এসেছে এবং ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে এলসি খোলা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটি দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোক্তাপণ্যের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সরবরাহ করে, তাই এই পরিস্থিতি দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গ্রুপটি তাদের কার্যক্রম সচল রাখতে এবং বকেয়া ঋণ ধাপে ধাপে পরিশোধের জন্য রাজস্ব তৈরি করতে অতিরিক্ত চলতি মূলধন অর্থায়নের অনুরোধ জানিয়েছে।

সিটি গ্রুপ সংকট কাটিয়ে উঠতে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে এবিবি। এর মধ্যে রয়েছে– হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের অংশ বিশেষ বিক্রি, মূলধন সহযোগী যুক্ত করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা, একটি স্বাধীন অডিট দল নিয়োগ, খরচ কমানোর ব্যবস্থা এবং সম্পদ বিক্রি করা। তবে এগুলো কার্যকর করতে কিছুটা সময় লাগবে বলে সম্প্রতি গ্রুপটির সঙ্গে ৩৫টি ব্যাংকের অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়। সর্বসম্মতিক্রমে একমত হওয়া গেছে, দীর্ঘদিনের বৃহৎ শিল্প গ্রুপকে সহায়তা করা এবং এটিকে পুনরায় পূর্ণ কার্যক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ব্যাংকিং খাতের স্বার্থেই অপরিহার্য। বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। প্রয়োজনে একটি স্বাধীন অডিট ফার্ম নিয়োগ করা হবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর এমডিরা শিগগিরই আবার বৈঠকে বসবেন। সেখান থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি যৌথ প্রস্তাব জমা দেওয়া হবে। 

যা বলছে সিটি গ্রুপ
সিটি গ্রুপের পক্ষ থেকে গত মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে কখনও খেলাপি না হওয়ার কারণে অর্থায়নকারী এবং অংশীজনের কাছে এটি একটি বিশ্বস্ত নাম। তবে গত চার বছরে গ্রুপটি কিছু চ্যালেঞ্জের কারণে গুরুতর আর্থিক ও পরিচালনগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। পুরো গ্রুপের তারল্য এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে যা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন ইউনিটগুলোতে অনিয়মিত এবং অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের সম্মুখীন হয়েছে। উৎপাদন দক্ষতা এবং সক্ষমতার ব্যবহারকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে। গ্রুপটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত গ্যাস বরাদ্দের ওপর ভিত্তি করে হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছয়টি বড় শিল্প ইউনিট স্থাপন করে। বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও গ্যাসের সংযোগ পায়নি। এখানকার কিছু কারখানা পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে আছে এবং বাকিগুলো চালুর কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। বিপুল পরিমাণের মূলধন বিনিয়োগ হলেও কোনো আয় আসছে না। অথচ পরিচালন খরচ হচ্ছে। আবার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। পুরো সিটি গ্রুপের নগদ প্রবাহ এবং ঋণ পরিশোধের ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

সিটি গ্রুপ আরও জানিয়েছে, স্বল্পমেয়াদি ডলার ঋণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে তারা। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। আর ডলারে আমদানি করলেও ব্যাংকিং সুবিধা টাকায় হওয়ায় প্রকৃত আমদানি সক্ষমতা ৪২ শতাংশ কমেছে। অর্থের বিবেচনায় যা ৯০ কোটি ডলার বা ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া সুদের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে যাওয়ায় ঋণ নেওয়ার খরচ অনেক বেড়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি না করার অনুরোধ জানানো হয় ওই চিঠিতে। একই সঙ্গে জনস্বার্থে একক গ্রাহকের ঋণসীমার বিদ্যমান বিধানের ক্ষেত্রে সাময়িক সময়ের জন্য ছাড় চাওয়া হয়। আর ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সঙ্গে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ, ব্যবসা চালিয়ে নিতে নতুন করে চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা এবং ১ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতপশিল সুবিধার অনুরোধ করা হয়।

সংকট কাটানোর পরিকল্পনা
বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া চিঠিতে সিটি গ্রুপ জানায়, স্বল্প মেয়াদে ঋণ পুনর্গঠনে বিভিন্ন সুবিধার বাইরে একটি মেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। এ ক্ষেত্রে আগামী তিন বছরের মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিছু সম্পদ বিক্রি এবং শেয়ার বিক্রির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে নতুন মূলধন সংগ্রহ নিয়ে কাজ চলছে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার অধীনে অলস পড়ে থাকা কারখানা ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করার জন্য একটি কৃত্রিম গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা। বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তারিত মূল্যায়ন করতে এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সুপারিশ করতে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

 

আরও পড়ুন

×