ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

বিল তুলে নিয়ে সেতুর কাজে আগ্রহ নেই ঠিকাদারের

বিল তুলে নিয়ে সেতুর কাজে আগ্রহ নেই ঠিকাদারের
×

ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতু। ছবি: সমকাল

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫২ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১২:১৫

দেড় বছরে সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু তিন বছরেও অর্ধেক কাজ শেষ হয়নি। কিন্তু ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৬০ শতাংশ বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। টাকা তুলে নেওয়ায় কাজের প্রতি ঠিকাদারদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এ অবস্থায় আগামী তিন বছরেও নির্মাণকাজ শেষ হবে না বলে শঙ্কা তাদের।

‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস’ কর্মসূচির অধীনে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি নদীর ওপর ২০২৩ সাল থেকে সেতুটি নির্মাণ করছে এলজিইডি।

জানা গেছে, মহারশি নদী ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর ও গৌরিপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। এতে দুই ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম আলাদা হয়ে পড়েছে। আহমেদনগর থেকে বনগাঁ, চতল গ্রাম পর্যন্ত যে সড়ক রয়েছে তার মধ্যে দিয়ে নদী প্রবাহিত হওয়ায় আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। গ্রীষ্মকালে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও বর্ষাকালে তাদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। সে সময় যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ নৌকায় করে যাতায়াত করেন।

এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকার মূল উৎস কৃষি। কিন্তু কৃষক নদী অথবা খানাখন্দে ভরা সড়ক পথে পণ্য নিয়ে ঝিনাইগাতী বাজারে যেতে পারেন না। কেউ অসুস্থ হলে বেকায়দায় পড়ে যান। নদীর পূর্ব দিকে বনগাঁ, চতলের মানুষকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার ঘুরে নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অথবা শেরপুর সদর হাসপাতালে যেতে হয়। পশ্চিম পারের বনগাঁ জিগাতলা, খাঁপাড়া, বন্ধভাটপাড়া, কালাকুড়াসহ কয়েক গ্রামের মানুষ অনেক কষ্ট করে আসেন ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

নদীর ওপর দুটি সেতু নির্মাণের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের দুর্ভোগ কমাতে গৌরিপুর ইউনিয়নের বনগাঁ বাজারের কাছে নদীর এক অংশে চার বছর আগে একটি সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় সেতুটি নির্মাণ না হওয়ায় দুর্ভোগ কিছুতেই কমছিল না। ২০২৩ সালে দ্বিতীয় সেতু নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করে এলজিউডি। কাজ পায় যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মমিনুল হক-স্বর্ণা ব্রিকস ও হালিমা এন্টারপ্রাইজ (জেবি)।

আহমেদনগর-বনগাঁ-চতল সড়কে ৭৫ দশমিক ৬ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয় সাত কোটি ৪৮ লাখ টাকা। কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট। কিছুদিন ভালোভাবে কাজ চললেও হঠাৎ করেই স্থবিরতা নেমে আসে। এরই মধ্যে উজানের ঢলে নদী ভাঙন বৃদ্ধি পায়। এতে যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফের কাজ বন্ধ করে দেয়। ঠিকাদারকে কাজ শেষ করার জন্য আরও দেড় বছর সময় দেয় এলজিইডি। গত ১৮ মে সেই মেয়াদও শেষ হয়। কিন্তু গত তিন বছরেও সেতুর অর্ধেক কাজ দৃশ্যমান হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, তিন বছরে সেতুর কাজ হয়েছে মাত্র ৪০-৪৫ শতাংশ। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭০ শতাংশ কাজ দেখিয়ে বিল তুলে নিয়েছে ৬০ শতাংশ।

চতল গ্রামের বাসিন্দা সদর ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা মোমিনুর রশিদের ভাষ্য– যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে ফলে আগামী তিন বছরেও সেতু হওয়ার কোনো সম্ভবনা নেই।
বনগাঁ এলাকার ফারুক মিয়া বলেন, ‘তিন বছর ধইরি পুল দিতাছে, এলাও তো হয়তাছে না। কবে হবো তাওতো বুঝতাছি না।’

জিগাতলা গ্রামের আব্দুর রহিম ও হোসেন আলী জানান, কাজই শেষ না করেই ঠিকাদার কয়েক কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছেন। তাই এখন কাজে মন নেই। ছয় মাসে একদিন আসেন। কিছু কাজ করে চলে যান। শ্রমিকদের বেতনও ঠিকমতো দেওয়া হয় না।

ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাদৎ হোসেনের ভাষ্য, কাজের ঠিকাদারই তো ঠিক নেই। খালি পরিবর্তন হচ্ছে। নির্মাণকাজ অনেক দিন বন্ধ। তিনি শুনেছেন ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৬০ শতাংশ বিল তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হারুণ মিয়া বলেন, তারা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত। একে একে তিনবার বন্যা হয়েছে। তাদের পাথর, রড, বালু, সিমেন্ট ঢলের পানিতে নিয়ে গেছে। এরপরও কাজ শুরু করেছেন তারা।

ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রকৌশলী অনতু বল জানান, তিনি সম্প্রতি এখানে এসেছেন। তিনি আসার পর আরও কিছু কাজ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এলজিইডির শেরপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য, আগামী শুকনো মৌসুমের মধ্যেই সেতুর অসমাপ্ত কাজ শেষ করা হবে। না করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেটুকু কাজ করেছে তার চেয়ে কম বিল দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×