ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

প্রায় ২০ ঘণ্টার চেষ্টায় ধ্বংসস্তূপ থেকে বাবাকে জীবিত উদ্ধার করলেন ছেলে

প্রায় ২০ ঘণ্টার চেষ্টায় ধ্বংসস্তূপ থেকে বাবাকে জীবিত উদ্ধার করলেন ছেলে
×

হোসে গার্সিয়া ও তার ছেলে। ছবি: আল-জাজিরা

আল-জাজিরা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১২:৫১ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১৩:২২

ভেনেজুয়েলার হোসে গার্সিয়ার কাছে ২৪ জুনের সন্ধ্যাটা ছিল অন্য দিনের মতোই। স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে লা গুয়াইরার উপকূলীয় শহর কারাবালেদার রিতাসোল প্যালেসের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে ছিলেন তিনি। কিন্তু স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটি আরও শক্তিশালী কম্পনে মুহূর্তেই ধসে পড়ে ১১ তলা ভবনটি।

চোখ খুলে হোসে বুঝতে পারেন, তিনি আর নিজের ফ্ল্যাটে নেই। ধসে পড়া ভবনের বেজমেন্টে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। পাশে আটকে আছে তার সাত বছর বয়সী ছেলে দিয়েগো ও ১২ বছরের সান্তিয়াগো। ৪৬ বছর বয়সী গাড়ির মেকানিক হোসে বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ার চেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আর কিছু হতে পারে না।’

তবে অন্ধকারের সেই মুহূর্তে এক কণ্ঠ তাকে নতুন করে বাঁচার আশা দেয়। পরে জানা যায়, সেই উদ্ধারকারীদের একজন ছিলেন তারই বড় ছেলে, ২৬ বছর বয়সী জেসুস গার্সিয়া। চোখে জল নিয়ে হোসে বলেন, ‘সে-ই আমার বড় ছেলে। ও-ই ছিল আমাকে উদ্ধার করা বীরদের একজন।’

একসময় লা গুয়াইরা ফায়ার সার্ভিসে কাজ করতেন জেসুস। ভূমিকম্পের আগেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে তার এক সাবেক সহকর্মী সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির কথা ভেবে তার পুরোনো হেলমেট ও জ্যাকেট সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। সেই সরঞ্জাম পরেই ভূমিকম্পের রাতে উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন জেসুস।

ধসে পড়া ভবনের সামনে পৌঁছেও তিনি জানতেন না, পরিবারের কেউ জীবিত আছেন কি না। সেখানে পৌঁছে প্রথমেই তার সাবেক সহকর্মী জানান, ‘তোমার বাবা দুই ছেলেকে নিয়ে নিচে জীবিত আছেন।’

বিশ্বাস করতে না পারলেও কিছুক্ষণ পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বাবার কণ্ঠ শুনতে পান জেসুস। হোসে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে এখানে ফেলে যেয়ো না।’ জেসুস তখন বাবাকে বলেন, ‘আমার ওপর ভরসা রাখুন। শান্ত থাকুন। বাচ্চাদেরও শান্ত রাখুন। আপনাদের উদ্ধার না করে আমি কোথাও যাচ্ছি না।’

এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে এক ঘণ্টার বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছিলেন হোসে। ছোট ছেলেকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছিলেন তিনি। আরেক ছেলে তার পাশেই চাপা পড়ে ছিল। তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না, শুধু একটি হাত ও একটি পা দেখা যাচ্ছিল।

বাবা ও দুই ভাই জীবিত আছেন নিশ্চিত হওয়ার পরই মরিয়া হয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন জেসুস। কিন্তু রাতের অন্ধকারে ভারী কংক্রিট সরানো সম্ভব ছিল না। পরদিন সকালে পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলের বিশেষ সরঞ্জাম পৌঁছানোর পর অভিযান নতুন গতি পায়।

লা গুয়াইরা ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও তাঁদের সাবেক সহকর্মীর পাশে দাঁড়ান। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২৫ জুন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে, অর্থাৎ ভূমিকম্পের প্রায় ২০ ঘণ্টা পর, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় হোসে ও তার দুই ছেলেকে।

হোসে বলেন, এই অভিজ্ঞতা তার জীবন চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। ‘জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি কৃতজ্ঞ থাকব। শুধু আমি নই, আমার দুই সন্তানও নতুন জীবন পেয়েছে।’

তবে এই অলৌকিক উদ্ধারকাহিনির মাঝেও রয়ে গেছে গভীর বেদনা। হোসের স্ত্রী এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ। ভূমিকম্পের ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও তিনি আশা ছাড়েননি। হোসের ভাষায়, ‘আমার যেমন বিশ্বাস ছিল কেউ এসে আমাদের উদ্ধার করবে, তেমনি এখনো বিশ্বাস করি, তাকেও খুঁজে পাওয়া যাবে।’

সরকারি হিসাবে, ভেনেজুয়েলার এই জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৩৪২ জনে পৌঁছেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৮৫৬টি ভবন এবং সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে ১৯০টি ভবন। তবে স্বাধীন বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

এখন দিনের বেশির ভাগ সময় ধসে পড়া রিতাসোল প্যালেসের পাশে কাটান হোসে। উদ্ধারকারীদের কাজ নীরবে দেখেন আর নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এর মূল্য কত বড় হবে, সেটা এখনো জানি না।’
 

আরও পড়ুন

×