ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি বনাম মারামারি

বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি বনাম মারামারি
×

বিশ্বকাপের উন্মাদনা অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ায় রূপ নেয়

সোহেল নওরোজ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১৪:২৬

ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি আবেগ, সৌন্দর্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈশ্বিক মিলনের এক মহোৎসব। চার বছর পরপর এই আয়োজন এলে বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম–সবখানে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ জার্মানি, ফ্রান্স বা অন্য কোনো দলকে সমর্থন করে। বাড়ির ছাদে পতাকা ওড়ে, দেয়ালে রং লাগে, চায়ের দোকানে তর্ক জমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে বিশ্লেষণ ও রসিকতায়। এ আনন্দে কোনো দোষ নেই। বরং খেলাধুলার প্রতি মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বমানের ফুটবল দেখার আগ্রহ এবং বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া সুস্থ বিনোদনেরই অংশ। প্রসঙ্গটা আনন্দ করা যাবে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো–আমরা বৈশ্বিক এ প্রতিযোগিতা নিয়ে ঠিক কতটা মাতব?

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, পছন্দের দলের সমর্থনে উচ্ছ্বাস দেখাতে গিয়ে কেউ কেউ অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। যেমন স্ত্রীর নামে ঋণ নিয়ে বিরাটাকার পতাকা বানানো, সাজসজ্জা বা উৎসবের আয়োজন করার ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এমন উদাহরণ মনে করিয়ে দেয়, আবেগের সঙ্গে দায়িত্ববোধ না থাকলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশ্বকাপে পছন্দের দলকে সমর্থনের জন্য আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। কাজেই কতটুকু ব্যয় করলে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে তার প্রভাব পড়বে না সেটা অবশ্যই বিবেচ্য। উৎসব ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ঋণের বোঝা দীর্ঘস্থায়ী। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিশাল পতাকা, দামি সাজসজ্জা বা লোক দেখানো ব্যয় আবশ্যক নয়। একটি ছোট পতাকা, একটি জার্সি কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখা দিয়েও সমর্থন প্রকাশ করা যায়।

আবেগ যখন নিরাপত্তাবোধকে হারিয়ে দেয়, তখন পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়। গত ৯ জুন মানিকগঞ্জে ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। আবার ১৫ জুন চট্টগ্রামে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ২০ বছর বয়সী এক তরুণ প্রাণ হারিয়েছে। দুটি ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়, কয়েক মুহূর্তের উচ্ছ্বাসের মূল্য কখনো একটি জীবনের সমান হতে পারে না। পতাকা টাঙাতেই হলে নিরাপদ স্থান নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে আগে। তাছাড়া শিশু-কিশোরদের কোনোভাবেই এমন ঝুঁকির মধ্যে পাঠানো উচিত নয়।

বিশ্বকাপের উন্মাদনা অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ায় রূপ নেয়। বিশেষ করে ফেসবুকে কে কত বেশি উগ্রভাবে নিজের দলের সমর্থন দেখাতে পারে তা নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এতে অনেক সময় মিথ্যা তথ্য, উসকানিমূলক পোস্ট বা আক্রমণাত্মক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। দলীয় সমর্থন নিয়ে তর্ক কখনো কখনো ঝগড়ায় রূপ নেয়, এমনকি শারীরিক সংঘর্ষেও গড়ায়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, একটি দল হারলে বা জিতলে বাস্তব জীবনে আমাদের ব্যক্তিগত অবস্থানের পরিবর্তন হয় না। তাই অনলাইন উচ্ছ্বাস যেন কখনোই বাস্তব জীবনের গতি ও পারস্পারিক সম্পর্ক নষ্ট না করে। খেলার মূল শিক্ষা হলো প্রতিদ্বন্দ্বীকে সম্মান করা, নিয়ম মানা এবং জয়-পরাজয় স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। প্রিয় দল হারলে মন খারাপ হতেই পারে, কিন্তু তা যেন ক্রোধ, সহিংসতা কিংবা অন্যের প্রতি ঘৃণায় পরিণত না হয়।

বিশ্বকাপের উন্মাদনার আরেকটি বড় দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রবণতা। যে ব্যাধিতে আমাদের অনেকেই আক্রান্ত। অনেকেই নিজের পোস্ট, ভিডিও বা উদযাপনকে যতটা না আনন্দের জন্য করেন, তার চেয়ে বেশি করেন ‘ভাইরাল’ হওয়ার উদ্দেশ্যে। কে কত বড় পতাকা টাঙাল, আনন্দ মিছিল বের করল বা বাড়ির দেয়াল প্রিয় দলের পতাকার রঙে রাঙাল–এসব প্রদর্শনমূলক প্রতিযোগিতা দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়, অন্যরা আরও অতিরঞ্জিতভাবে নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা করে। কখনো কখনো এ প্রবণতা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণকেও উৎসাহিত করে, কারণ ভাইরাল হওয়ার আকর্ষণ নিরাপত্তা ও বিবেচনাকে আড়াল করে ফেলে।

পরিমিতিবোধ কেবল আবেগ বা আচরণের মধ্যেই নয়, সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের অনেক ম্যাচই গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় তা শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন রুটিনে প্রভাব ফেলতে পারে। পড়াশোনা, কাজের চাপ এবং শারীরিক বিশ্রামের সঙ্গে ভারসাম্য না রাখলে সাময়িক বিনোদন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাত জেগে খেলা দেখা বা উদযাপনের কারণে পরদিনের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যঘাত ঘটতে পারে। আনন্দকে গুরুত্ব  দেওয়ার প্রয়োজন আছে, কিন্তু জীবন ও দায়িত্বের অগ্রাধিকারকে কখনোই অগ্রাহ্য করা সমীচীন নয়।

সার কথা, বিশ্বকাপ আমাদের আনন্দের অন্যতম উৎস, বিভেদের নয়। সমর্থন থাকবে, বিতর্ক থাকবে, আবেগ থাকবে–কিন্তু তার সীমারেখাও থাকতে হবে। আনন্দ-উদযাপন হতে হবে সংযত, নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে। মনে রাখা আবশ্যক, বিশ্বকাপকে ঘিরে আমাদের উচ্ছ্বাস যেন কারও জীবনের ক্ষতি, সম্পর্কের ভাঙন বা সামাজিক বিভাজনের কারণ না হয়। বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা মাতব অবশ্যই, কিন্তু এমনভাবে মাতব, যাতে উৎসব শেষে আনন্দের স্মৃতি থাকে–অনুশোচনা, ঋণ বা শোক নয়।

সোহেল নওরোজ: যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×