সমকালীন প্রসঙ্গ
শিল্প খাতে নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও স্থবিরতার কারণ
বিপুল সংখ্যক শিল্পকারখানা এভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কাজ হারানো উদ্বেগজনক
আবু তাহের খান
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৫৮
‘দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ’– এটি ছিল গত ৩ জুলাইয়ের সমকালের শীর্ষ সংবাদ। সংবাদে ওঠে আসা তথ্যগুলো উদ্বেগজনক মনে হলেও ঘটনাটি আকস্মিক নয়। গত প্রায় দুই বছর ধরে দেশে যে ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজমান ছিল, তাতে শিল্প খাতে এমনটি ঘটাই স্বাভাবিক। তবে এ ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতার বাইরেও শিল্প খাতকে ঘিরে রাষ্ট্রের কিছু নীতিগত সমস্যাও আজ অনেক বছর ধরে চলে আসছে, যেগুলোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ধারণাগত উপলব্ধিতে যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি সেসব ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে আনুষঙ্গিক নীতি ও দলিল সংশোধনের ব্যাপারেও রয়েছে ব্যাপক উদ্যমহীনতা। অন্যদিকে নতুন শিল্প স্থাপন ও স্থাপিত শিল্পকারখানাকে পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় সচল ও উৎপাদনশীল রাখার জন্য যে ধরনের রাষ্ট্রসেবা ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রয়োজন, সেটি সরবরাহের ক্ষেত্রেও দেশে ব্যাপক মন্থরতা ও অদক্ষতা বিরাজমান রয়েছে। বস্তুত এই ত্রিমাত্রিক সমস্যারই (রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা, নীতি পর্যায়ে ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গিগত ত্রুটি এবং সেবা ও অবকাঠামোগত সহায়তার ক্ষেত্রে ধীরগতি ও অদক্ষতা) অনিবার্য ফলাফল হচ্ছে উল্লিখিত সংবাদ প্রতিবেদনে ওঠে আসা নানা উদ্বেগজনক তথ্যাদি।
উল্লিখিত প্রতিবেদনের তথ্য থেকে দেখা যায়, গত দুই বছরে দেশে ৫০০ শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে (ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবালের মতে যে সংখ্যা এর দ্বিগুণ), শুধু পোশাক খাতেই দেড় লাখের বেশি মানুষ কাজ হারিয়েছে, একই খাতে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ কমে গেছে এবং সর্বোপরি সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার কমতে কমতে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে এসে নেমেছে, যেখানে এ সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ যে কোনো বিকাশমান অর্থনীতিতে শিল্প খাতেই প্রবৃদ্ধির হার থাকার কথা সবচেয়ে বেশি, যেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। বিপুল সংখ্যক শিল্পকারখানা এভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া, ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কাজ হারানো, উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেতে পেতে গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা ইত্যাদি বিষয়গুলো এই মুহূর্তে এ খাতের জন্যই শুধু উদ্বেগজনক নয়– অর্থনীতির সার্বিক বিকাশের পথেও এটি একটি বড় বাধা। কারণ শিল্প খাতে এগোতে না পারলে অন্য খাতে এগোনোর কাজটি মোটেও সহজ হবে না।
পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের মতোই ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের শিল্পনীতিতেও শিল্প বলতে উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) কার্যক্রমকেই বুঝানো হতো। কিন্তু ১৯৯১ সালে এসে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরামর্শে সরকার তার শিল্পনীতিতে সেই যে সেবা খাতকেও শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করে উভয়ের জন্য সমসুবিধার নীতি গ্রহণ করল, সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা একই ধারায় অব্যাহত আছে। এ সময়ের মধ্যে দেশে একাধিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও কেউই এটি বদলায়নি এবং এর অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে সেবা খাত মোটামুটি ভালোভাবে বিকশিত হলেও উৎপাদন শিল্প খাত ক্রমেই কোণঠাসা হতে হতে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশের প্রবৃদ্ধির ঘরে নেমে এসেছে। সেই সুবাদে বাংলাদেশের বাজার দিনে দিনে আরও বেশি করে বিদেশি পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ দেশের পক্ষে সহসা উৎপাদক রাষ্ট্র হয়ে ওঠবার কোনোই সম্ভাবনা নেই। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, সেবা খাতের গুরুত্ব না কমিয়েও দেশে উৎপাদন খাত ও ব্যবসায়ের (ট্রেডিং) জন্য আলাদা আলাদা প্রণোদনা সুবিধার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা যেত। কিন্তু গত সাড়ে তিন দশকের মধ্যকার কোনো সরকারই তা করেনি। ফলে এরূপ পরিস্থিতিতে খুব স্বাভাবিকভাবেই দেশের অধিকাংশ উদ্যোক্তা উৎপাদন শিল্পের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে সহজ ব্যবসায়ের দিকে ঝুঁকেছে।
শিল্প খাতের নীতি সহায়তা ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম এখন নানা বিচিত্র সংস্থা, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের আওতায় ন্যস্ত– যার মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও কিছুদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় ইইএফ তহবিলের আওতায় শিল্প খাতে ঋণ দিয়েছে, যা ছিল একটি খুবই ভ্রান্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তো এমনি একটি হযবরল অবস্থার কারণে গত ৫৫ বছরেও শিল্প খাতের নীতি ও কার্যক্রম পরিধারণের জন্য দেশে কোনো সমন্বিত পরিধারণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বা গড়ে ওঠতে পারেনি। ফলে শিল্প খাতের নীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ইত্যাদি সবই আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের আওতায় খণ্ড খণ্ড (পিচমিল) ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে উদ্যোক্তাদেরও প্রয়োজনীয় সেবা সহায়তার জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে চর্কির মতো ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। তবে এ ঘোরাঘুরিতেও সমস্যা ছিল না, যদি না ঘুরতি পথে সেসব স্থানে হয়রানিমুক্ত ও ঝঞ্জাটবিহীন পরিবেশে কাঙ্ক্ষিত সেবাটি পাওয়া যেত।
এবার তৃতীয় পর্যায়ের আলোচনায় অবকাঠামোগত সহায়তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিরাজমান ধীরগতি ও অদক্ষতার বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যাক, যেটি সমকালের উপরোক্ত প্রতিবেদনে উদ্যোক্তাদের অভিমত ও প্রতিক্রিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। আসলে শিল্প স্থাপন ও স্থাপিত শিল্প চলমান রাখার জন্য প্লট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য যেসব ভৌত উপকরণ সহায়তা প্রয়োজন, সেগুলো ঠিকমতো না পাওয়ার কারণেই দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা এখন নিম্ন-উৎপানশীলতায় ভুগছে। ওই যে ৫০০ বা তার দ্বিগুণ সংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে গেল, দেড় লাখ লোক কাজ হারালো, ২০০ কোটি ডলারের কার্যাদেশ কমে গেল ইত্যাদি অধিকাংশ ঘটনার জন্যই দায়ী হচ্ছে শেষোক্ত অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অমার্জনীয় ধীরগতি, হয়রানি ও অদক্ষতা। অনৈতিক লেনদেনের ভিত্তিতেও যদি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ সেবা সহায়তাগুলো দক্ষতার সঙ্গে প্রদান করা হতো, তাহলে নিরুপায় উদ্যোক্তারা সেটিকেও ‘হাসিমুখে’ মেনে নিতে রাজি আছেন (অনৈতিক লেনদেনকে সমর্থন করা হচ্ছে না)।
মোটামুটিভাবে এ হচ্ছে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কাম্য উৎপাদনশীলতায় সেগুলো না চলা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসতে না পারা, কার্যাদেশ কমে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়ক সমস্যাগুলোর অন্তরালের মূল কারণ। এ সংকটময় পরিস্থিতি থেকে বেরুনোর লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাবও এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো: এক. মব ও উগ্রপন্থা প্রভাবিত কার্যক্রমকে রাজনৈতিক পক্ষপাতহীনতার ঊর্ধ্বে ওঠে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; দুই. অবিলম্বে শিল্পনীতি সংশোধন করে উৎপাদন শিল্পের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থাদি গ্রহণ করতে হবে; তিন. উৎপাদন শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তাদি দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে পরিপূরণে সচেষ্ট হতে হবে; চার. দেশের সকল নৌ, স্থল ও বিমানবন্দরকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানির জন্য উদ্যোক্তাবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে; পাঁচ. রাষ্ট্রের পুঁজি সহায়তা কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও ত্বরিত গতিসম্পন্ন করে তুলতে হবে এবং সর্বোপরি ছয়. রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিল্পকে অগ্রাধিকারমূলক শীর্ষ খাত হিসেবে গণ্য করে সে অনুযায়ী আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাদি গ্রহণ করতে হবে।
তবে অভিজ্ঞতা বলে, এ দেশের আমলাতন্ত্র-নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থায় সব প্রস্তাবের কতটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্ব পাবে, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মর্মে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষত শিল্প খাত এই মুহূর্তে মোটেও ভালো অবস্থায় নেই। সে ক্ষেত্রে শিল্প খাতের উল্লিখিত সমস্যাগুলোর প্রতি জরুরি ভিত্তিতে মনোযোগ দিতে না পারলে নিকট ভবিষ্যতের দিনগুলোয় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যথেষ্টই নাজুক হয়ে পড়তে পারে, যেটি হওয়ার ঝুঁকি একটি দায়িত্বশীল সরকারের পক্ষে নেওয়াটা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না বলে মনে করি।
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়
- বিষয় :
- শিল্পকারখানা
