তৃতীয় মেরু
তিস্তা মহাপরিকল্পনার নথিপত্র উন্মুক্ত হোক
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৬
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত চীনা সহায়তাতেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশ সরকার কয়েক কদম এগিয়ে গেছে। বিশেষত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের মধ্য দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে।
আমরা দেখেছি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে শুরু থেকেই ঢাকঢাক গুড়গুড় ছিল। টানা তিন মেয়াদের পর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকার—সবাই যেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘শাশ্বতী’ কবিতার মতো ‘একটি কথার দ্বিধাথরথর’ নিয়ে ছিল। এবারই সম্ভবত সেই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলা হলো।
২২-২৬ জুন অনুষ্ঠিত ওই সফরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর যে যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়, এর ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে– ‘চীনা পক্ষ তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা ও সাহায্য প্রদান করবে এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে উভয় দেশের বিশেষজ্ঞদের সমর্থন করবে। তারা সামুদ্রিক বিষয়াবলিতে সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে’ (চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট)।
সফর থেকে ফিরেও জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধামন্ত্রী ‘যে কোনো মূল্যে’ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন। প্রকল্পটিকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে (সমকাল, ৩০ জুন ২০২৬)।
প্রশ্ন হচ্ছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এই পর্যায়ে এলো কীভাবে? অনেকে জানেন, প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরের জন্য ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ চুক্তিটি ঝুলে গিয়েছিল মূলত পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে। শেখ হাসিনার টানা তিন মেয়াদের শেষের দিকে ‘বিকল্প ব্যবস্থা’ হিসেবে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ। এতেই ভারত নড়েচড়ে বসেছিল। ২০২৪ সালের ২১-২২ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির সর্বশেষ শীর্ষ বৈঠকের যৌথ বিবৃতির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল– ‘উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ হিসেবে পারস্পরিক সম্মত সময়সীমার মধ্যে ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমরা তিস্তা নদীর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাগত উদ্যোগ গ্রহণ করব।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এসে আবার চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরকালে ‘চীনের পুনঃপ্রবেশ’ নিশ্চিত করে যৌথ ঘোষণার ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল– ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনা কোম্পানির অংশগ্রহণকে বাংলাদেশ পক্ষ স্বাগত জানায়।’
সেই সফরের পর রংপুর অঞ্চল থেকে দলমত নির্বিশেষে দাবি উঠতে থাকে– নির্বাচনের আগেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হোক। তখনই এক নিবন্ধে বলেছিলাম, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সদিচ্ছা এবং রংপুরবাসীর অধীর আগ্রহ সত্ত্বেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বল এখন চীনের কোর্টে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের কাছে বলটি ফেরত দিতে চাইছে। মাঠ পর্যায়ের নেতারা যা-ই বলুন, আগামী নির্বাচনে ক্ষমতার দৌড়ে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোও নিশ্চয়ই মাত্র কয়েক মাসের অপেক্ষার বিনিময়ে এই মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সুযোগ ছাড়তে চাইবে না’ (সমকাল, ২৬ অক্টোবর ২০২৫)।
বাস্তবে সেটাই ঘটলো। প্রশ্ন হচ্ছে, চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন মোটামুটি চূড়ান্ত হওয়ার পর এখন করণীয় কী? বাংলাদেশ ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় এটা স্পষ্ট, এখন নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে এবং সেখানে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হবে। এটা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য।
আমরা জানি, ২০১৯ সালের জুন এবং ২০২৩ সালের জুলাই মাসে দুটি সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল। সেই সমীক্ষা দুটি নিয়ে অনেক প্রশ্নও ছিল। এ ছাড়া, সমীক্ষায় যে ৫৫-৬০ জন বিশেষজ্ঞ যুক্ত ছিলেন, তাদের সবাই চীনা নাগরিক। আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম, বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ নেই কেন? দেশীয় বিশেষজ্ঞ বা প্রকৌশলীরা তিস্তার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারের বিষয়টি বোঝেন না? মন্দের ভালো, শেষ পর্যন্ত নতুন নতুন সমীক্ষা হচ্ছে এবং সেখানে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে।
এ ছাড়া এখন আরও অন্তত চারটি বিষয় নিশ্চিত হতে হবে। প্রথমত, এটা স্পষ্ট, তিস্তার প্রধান সংকট ভাঙন। যে কোনো পরিকল্পনা বা মহাপরিকল্পনার মূল বিষয় হওয়া উচিত ভাঙন রোধে নদী ব্যবস্থাপনা। কিন্তু মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিস্তার পরিবেশ-প্রতিবেশ যে কোনো মূল্যে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে নদীভাঙন রোধ ও নাব্য রক্ষায় বান্ধালের মতো লোকায়ত, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত, টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা হতে হবে বহুপক্ষীয়। এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারত ছাড়াও নেদারল্যান্ডস, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকার মতো পক্ষকে যুক্ত করা যেতে পারে। চীনের অর্থায়ন, ভারত থেকে পানির নিশ্চয়তার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা যেমন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিবেশগত গাইডলাইন নিশ্চিত করবে, তেমনই নেদারল্যান্ডস দিতে পারে বিশ্বমানের কারিগরি সহযোগিতা।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্বে হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার নথিপত্র উন্মুক্ত করা উচিত। এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু জনসাধারণের মতামত গ্রহণই নয়; স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নথিপত্র নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হওয়া উচিত, যাতে জনসাধারণ ‘ইনফরমড’ মতামত দিতে পারে। আর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এমনকি প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যারা দ্বিমত প্রকাশ করে থাকেন, তাদের নিয়েও আলোচনা করতে হবে। কারণ, তিস্তার নদীভাঙন রোধ, এর প্রতিবেশগত ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন সবাই চায়; চিন্তা ও তৎপরতার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
চতুর্থত, ভুলে যাওয়া চলবে না, তিস্তা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে জটিল আন্তঃসীমান্ত নদী; সীমান্তের দুই পাশেই কেবল দুটি বৃহৎ ব্যারাজ নয়; কয়েক ডজন ড্যামও রয়েছে। ফলে কোন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ স্বাক্ষরের মাধ্যমে তিস্তায় বাংলাদেশের অববাহিকাভিত্তিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উজান থেকে শুকনো মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
এটা ঠিক, তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যু ২০১১ সাল থেকে ঝুলিয়ে রেখে ভারত কার্যত নিজের পায়েই কুড়াল মেরেছে। সেটা এখন দিল্লি থেকেও অনুভূত হচ্ছে। দেশটির খোদ ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সেক্রেটারিয়েটের সাবেক পরিচালক তারা কর্তা সম্প্রতি নিবন্ধে বলেছেন, ঢাকায় উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক হাইকমিশনার নিয়োগ দিলেও তিস্তার পানি ভারতের জন্য ইতোমধ্যে যথেষ্ট ঘোলা হয়ে গেছে। আর সেখানে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের অবিমৃষ্যকারী ‘পুশইন’ নীতি (এনডিটিভি, ২ জুলাই ২০২৬)।
তিনি লিখেছেন, এখন ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করতে চাইলে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়নে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে গঙ্গার প্রবাহ সমীক্ষায় বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করতে হবে। আর তিস্তা প্রকল্পের জন্য চীনের চেয়েও ‘জেনারাস প্যাকেজ’ অফার করতে হবে।
তারা কর্তার মতে, ‘ইটস নেভার টু লেট’। কিন্তু ঢাকা থেকে দেখলে, ইতোমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিস্তার শুকনো বুকেও তিরতির করে অনেক পানি বয়ে গেছে।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- তিস্তা মহাপরিকল্পনা
- শেখ রোকন
