চারদিক
মেডিকেল বর্জ্য হতে পারে সম্পদ
সাহেদ ইমরান
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩৩
সরকারি হাসপাতালের পেছনের গলিতে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, রক্তমাখা গজ, ছেঁড়া গ্লাভস আর সাধারণ আবর্জনা একসঙ্গে স্তূপ হয়ে থাকে। এটি যেন চিরচেনা দৃশ্য। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ নাক চেপে দ্রুত পার হয়ে যান। কেউ ভাবেন না এই স্তূপের ভেতর থেকে কী পরিমাণ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বাতা, মাটি, এমনকি পানিতে। এই দৃশ্য শুধু একটি হাসপাতালের নয়; সারাদেশের কমবেশি প্রায় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানেরই সাধারণ চিত্র।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ২০২০ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিক থেকে প্রতিদিন প্রায় আড়াইশ টন মেডিকেল বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার প্রায় ৮৬ শতাংশই যথাযথ প্রক্রিয়াকরণের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সংখ্যাটা শুনতে শুকনো পরিসংখ্যান মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রকৃত বিপদ।
মেডিকেল বর্জ্যকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে সাধারণত কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যেমন সংক্রামক বর্জ্য (ইনফেকশাস ওয়েস্ট), শার্প ওয়েস্ট বা ধারালো বর্জ্য (সিরিঞ্জ, সুচ, ব্লেড), প্যাথলজিক্যাল বর্জ্য (মানবদেহের টিস্যু বা রক্ত) এবং রাসায়নিক-ফার্মাসিউটিক্যাল বর্জ্য। এর মধ্যে সংক্রামক ও ধারালো বর্জ্যই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এগুলোর মধ্য দিয়ে রক্তবাহিত রোগজীবাণু (ব্লাড বর্ন প্যাথোজেন) সরাসরি মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। ব্যবহৃত সুচ বা সিরিঞ্জ থেকে আঘাত পেয়ে হেপাটাইটিস-বি ও হেপাটাইটিস-সি, এমনকি এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। অপরিশোধিত বর্জ্যের মাধ্যমে টিটেনাস, বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত ত্বক ও ক্ষত সংক্রমণ (সেপটিক ইনফেকশন) ছড়াতে পারে।
সমস্যাটা আইনের অভাবে নয়, ২০০৮ সালেই দেশে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিধিমালা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দেড় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার বাস্তবায়ন কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ।
রাজধানীর নামি হাসপাতালগুলোতেও দেখা যায়, সংক্রামক আর সাধারণ বর্জ্য একই বিনে মিশে যাচ্ছে। নির্ধারিত রঙের পাত্র নেই; ঢাকনা প্রায়ই খোলা থাকে। আবার নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বিক্রয়যোগ্য প্লাস্টিক আর সিরিঞ্জ বেছে নেন বর্জ্যের স্তূপ থেকে, যা পরে অজান্তেই আবার বাজারে চলে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন আর স্থানীয় সরকার; সবাই যার যার জায়গায় দায়িত্বের কথা বলে, কিন্তু কারও দায়বদ্ধতা স্পষ্ট নয়। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশ একই সমস্যাকে সুযোগে বদলে ফেলেছে।
জার্মানিতে হাসপাতাল বর্জ্যের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ উৎসেই আলাদা করা হয়। জীবাণুমুক্ত করার পর তার একাংশ ব্যবহৃত হয় জ্বালানি হিসেবে। বছরের পর বছর গড়ে তোলা বর্জ্য থেকে শক্তি অবকাঠামো এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। জাপানে অটোক্লেভ আর মাইক্রোওয়েভভিত্তিক প্রযুক্তিতে বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করার পর প্লাস্টিক অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালে রূপান্তর করা হয়। ফলে পোড়ানোর দরকারই কমে আসে। সুইডেন এক ধাপ এগিয়ে। সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে পুরোপুরি ‘বর্জ্য মানেই সম্পদ’ দৃষ্টিভঙ্গিতে সাজানো। হাসপাতাল বর্জ্যের একাংশ সরাসরি যায় কেন্দ্রীয় তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্টে। এই দেশগুলোর মধ্যে মিল একটাই। তারা বর্জ্যকে বোঝা মনে না করে একটা প্রক্রিয়াজাত পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে দেখে।
বাংলাদেশেও এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এখন সময়ের দাবি। শুরুটা হতে পারে উৎসেই বর্জ্য আলাদা করার নিয়ম কঠোরভাবে মানার মাধ্যমে। এরপর পোড়ানোর বদলে অটোক্লেভ বা মাইক্রোওয়েভভিত্তিক জীবাণুমুক্তকরণে বিনিয়োগ করা গেলে পরিবেশদূষণ অনেকটাই কমে আসবে।
জীবাণুমুক্ত প্লাস্টিক ও অন্যান্য উপাদানের জন্য একটা বৈধ, নিয়ন্ত্রিত পুনর্ব্যবহার বাজার গড়ে তোলা গেলে– যা এখন অনানুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলছে, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়। তখন এটা হয়ে উঠতে পারে আয়েরও একটা বড় উৎস। আর সবচেয়ে জরুরি হলো একটিমাত্র কর্তৃপক্ষের হাতে সমন্বয়ের ভার তুলে দেওয়া। স্বাস্থ্য, পরিবেশ আর স্থানীয় সরকার যদি আলাদা পথে হাঁটতে থাকে, এই জট কখনোই খুলবে না।
ডা. সাহেদ ইমরান: সহকারী অধ্যাপক, শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা
- বিষয় :
- চারদিক
