ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

জ্বালানি চাহি, ঝুঁকি চাহি না

জ্বালানি চাহি, ঝুঁকি চাহি না
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৮

বহু প্রতীক্ষার পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে। আগস্ট মাসের মধ্যে কেন্দ্র হইতে উৎপাদিত প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হইবার কথা। তবে এই প্রাপ্তির সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে কয়েকটি প্রশ্ন। তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা চুক্তি লইয়া। এতদ্ব্যতীত বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ না হওয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, দক্ষ জনশক্তি দ্বারা পরিচালিত হইতে পারিবে কিনা– সেই সকল প্রশ্নও জরুরি।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ তৈরির পর যে ব্যবহৃত জ্বালানি বা বর্জ্য বাহির হইয়া থাকে, তাহাই স্পেন্ট ফুয়েল। ইহা প্রচণ্ড উষ্ণ এবং উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় হয়। প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই বর্জ্যগুলি রাশিয়ায় ফেরত পাঠাইবার কথা হইয়াছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে আসিয়াও এই বর্জ্য ফেরত লইবার বিষয়ে রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত ও বাধ্যবাধকতামূলক চুক্তি সম্পন্ন হয় নাই। রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র লইয়া রবিবার সমকালে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই বিপজ্জনক বর্জ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের কোনো অবকাঠামো বা ব্যবস্থা নাই। 

এইদিকে বলা হইতেছে, রূপপুরে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হইয়াছে এবং উহাতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসৃত। এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু পারমাণবিক নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তির বিষয় নহে। ইহা দক্ষতা, সততা, জবাবদিহিরও প্রসঙ্গ। বিশ্বের ইতিহাসে চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো ঘটনা ঘটিয়াছিল। সেই অভিজ্ঞতা মনে করাইয়া দেয়, অনেক সময় প্রযুক্তিগত ত্রুটি হইতে মানবিক ভুল, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কিংবা সিদ্ধান্তগত ব্যর্থতাই বৃহৎ বিপর্যয়ের কারণ হইয়া উঠিতে পারে। পাঠকের স্মরণ থাকিবে, গত বছরের মে মাসে এই প্রকল্পের ১৮ জন প্রকৌশলীকে চাকুরি হইতে অব্যাহতি দেওয়া হইয়াছিল। তন্মধ্যে ১৫ জন ছিলেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রায় এক লাখ ১৪ সহস্র কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ রাশিয়ার, যেই ঋণ ২৮ বৎসরের মধ্যে পরিশোধ্য। 

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এইখানে বৃহদাকার কোনো দুর্ঘটনা ঘটিলে উহার প্রভাব শুধু সন্নিহিত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকিতে পারে না। কৃষি, নদী, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত উহার অভিঘাত বহন করিতে হইতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষকে সরাইয়া লইবার সক্ষমতা, চিকিৎসার প্রস্তুতি, তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মহড়া– এই সকল বিষয়ে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র লইয়া জনগণের নিকট পর্যাপ্ত তথ্য নাই। অথচ পারমাণবিক নিরাপত্তায় জনআস্থা গড়িয়া উঠে তথ্যের স্বচ্ছতার মাধ্যমে; গোপনীয়তার মধ্যে নহে।

রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফায় বৃদ্ধি পাইয়াছে। বিদেশি ঋণের সুদ, পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহৃত জ্বালানির ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতে কেন্দ্রটি বন্ধ করিয়া দেওয়ার ব্যয়– সকল কিছু বিবেচনায় লইয়া প্রতি ইউনিট মূল্য নির্ধারণ করিতে হইবে। তবে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে সাধারণ মানুষের কথা ভাবা জরুরি।

এই প্রকল্পের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে ইহাই উপলব্ধ– দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণসহ একাধিক জরুরি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি চূড়ান্ত হয় নাই। কেন্দ্রের পরবর্তী ৬০ হইতে ৯০ বৎসর জীবনকালে নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও কারিগরি জ্ঞান নিশ্চিতকরণ জরুরি। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রথম তিন বৎসর জ্বালানি সরবরাহ করিবে। তবে ইহার পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম আমদানির কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয় নাই। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং আপৎকালীন প্রযুক্তিগত সহায়তা চুক্তিসমূহেরও অধিকাংশ ঝুলন্ত। তবুও এই সকল ব্যর্থতা ছাপাইয়া যায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়া আনন্দের সংবাদে। 

রূপপুর বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক হইতে পারে। তবে সেই সক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা হইবে নিরাপদ পরিচালন, নির্ভুল তদারকি এবং পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের তাড়নায় নিরাপত্তার প্রশ্নকে দ্বিতীয় সারিতে ঠেলিয়া দিলে ইহাকে সফল প্রকল্প দাবি করা চলিবে না।

আরও পড়ুন

×