ইরান
খামেনির জানাজার কূটনৈতিক তাৎপর্য
এলিস জেভরি
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪০
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে সৌদি প্রতিনিধি দল এগিয়ে যায়, তখন কোরআনের যে অংশ তেলাওয়াত করা হয়েছিল, তা কারও নজর এড়ায়নি। সুরা আল-ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত পড়া হয়, যে অংশে বদরের যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। যেখানে সংখ্যায় অত্যন্ত কম এবং অপ্রতুল যুদ্ধাস্ত্রের মুসলিম বাহিনী ‘আল্লাহর ইচ্ছায়’ অনেক বড় বাহিনীর ওপর জয়ী হয়েছিল। এটি ছিল একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। অর্থাৎ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের হিসেবে দেখানো হয়েছে। ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান সৌদি আরবের ভূখণ্ডে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
প্রশ্ন হলো– এই তেলাওয়াতটি কি একটি প্রশংসা ছিল; একটি বিদ্রূপ; নাকি উভয়ই। তবে এটি কোনো আকস্মিক বিষয় ছিল না। উদারভাবে ভাবলে, আয়াতটি ইসলামের অন্যতম প্রথম বিজয়ের দিকে ইঙ্গিত করে এবং তেহরান ও রিয়াদের মধ্যকার যৌথ সভ্যতার স্মৃতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু ইরান কেবল এই যুদ্ধেই টিকে থাকেনি, বরং তারা এই যুদ্ধ থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন সম্পূর্ণভাবে তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসে। তবে সৌদি আরব যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নীরব ছিল। কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমনকি গোপনে ইরানের ওপর আক্রমণে সাহায্য করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে আয়াতটির তাৎপর্য আরও গভীর। রিয়াদ যখন নিষ্ক্রিয় ছিল বা ওই সব প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে কাজ করছিল, তখন ইসরায়েল ‘অঞ্চলটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার’ চেষ্টা করছিল।
খামেনির জানাজায় কেবল সৌদি আরবই নয়, বরং ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন, যারা দেশটির প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন। এসব উপস্থিতি ইরানকে নিজস্ব শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ করে দেয়, যা ইঙ্গিত করে– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল চাইলেও দেশটি বিচ্ছিন্ন নয়।
৮৬ বছর বয়সী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্য তেহরানে তাঁর বাসভবনে ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় প্রাণ হারান। এই হামলায় তাঁর ১৪ মাস বয়সী নাতনি, জামাতা এবং পুত্রবধূও নিহত হন। তাঁর মরদেহ তিন দিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয়। এটি দেশটির ইবাদতের বৃহত্তম কমপ্লেক্স এবং প্রধান রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানমালার কেন্দ্রস্থল। জানাজা ধর্মীয় হলেও, এটি ছিল এক ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রদর্শনী। ইরান এর মাধ্যমে নিজস্ব জনগণকে জানাতে চেয়েছিল– রাষ্ট্র এখনও বিজয় ও শোকের মাঝে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে; মিত্রদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিল– তেহরান দমে যায়নি; পরাশক্তিদের দেখাতে চেয়েছিল– তারা ভেঙে পড়েনি; প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিল– তারা হিসাব রাখছে। আয়াতটি নির্বাচনেও দৃশ্যত সফরকারী প্রতিনিধি দলগুলোর কাছে প্রতীকীভাবে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে, যেখানে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে– তারা কীসের জন্য লড়াই করছে। পাশাপাশি তেহরানের চোখে প্রতিটি সরকারের অবস্থান কোথায়, তাও পরিষ্কার করে দিয়েছে। আয়াতগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালে একটি বিন্যাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ, হুতি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং আফগানিস্তানের তালেবানদের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলোতে শাহাদাত, আল্লাহর কাছে দেওয়া অবিচল প্রতিশ্রুতি এবং বিজয়ের কথা বলা হয়। এরা সবাই প্রতিরোধের অক্ষ শক্তি।
রাশিয়া, চীন, ভারত এবং মিসরের মতো যারা ইরানের রাষ্ট্রীয় মিত্র, তাদের জন্য কোরআনের তেলাওয়াত লক্ষণীয়ভাবে ছিল শান্ত ঘরানার। এগুলো যুদ্ধের চেয়ে বরং ধার্মিকতা, আশ্বাস ও পুরস্কার সম্পর্কিত আয়াত ছিল। বস্তুত এরা সেসব রাষ্ট্র, যারা খামেনির জানাজায় উপস্থিত হয়ে তেহরানকে বৈধতা দিয়েছিল।
ইরানের আঞ্চলিক অংশীদার কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিসরের প্রথম তেলাওয়াতটি এর মাঝামাঝি কোনো অবস্থানে ছিল– প্রশংসিত, স্বাগত জানানো, কিন্তু প্রতিরোধের শিবিরের অংশ হিসেবে আলিঙ্গন করা হয়নি। কাতার গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ ও তালেবানকে দেওয়া সেই একই ‘স্পষ্ট বিজয়’-এর আয়াতটি পেয়েছে, তবে তা একটি কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর অর্থকে অনেকটাই নরম করে দেয়, যা যুদ্ধের আহ্বান নয় বরং সমর্থনের জন্য একটি প্রশংসা। এগুলো হলো সেসব সরকার যারা দুটি জগতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখছে: বাণিজ্য, মধ্যস্থতা বা আঞ্চলিক রাজনীতির মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু একটি সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনে আদর্শিক অংশীদার হিসেবে চিত্রিত হতে অনিচ্ছুক।
এলিস জেভরি: তুরস্কের সাংবাদিক; মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- ইরান
- আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
