ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি

নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি
×

ফারাহ্ কবির

ফারাহ্ কবির

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৩

দেশের শ্রমবাজারে দীর্ঘদিন ধরে কিছু মৌলিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শ্রমশক্তি ও অর্থনীতিতে নারীর সীমিত ও অনিশ্চিত অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২৪ সালের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ২০২২ সালের রেকর্ড ৪২.৮ শতাংশ থেকে ৩৮.৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

২০২৩ সালে শ্রমবাজারে সক্রিয় নারীর সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৫৩ লাখ, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৩৭ লাখে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৬ লাখ নারী শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন। অন্যদিকে বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী (২০২৪), ৯৫.৯৬ শতাংশ নারী শ্রমজীবী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। সাধারণত এই খাতে কর্মরত নারীদের জন্য পেশাগত উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী খাতে অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও কর্মোদ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে উত্তরণ এবং মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ অনেকাংশেই নির্ভর করবে নারীর কর্মশক্তি, দক্ষতা ও সম্ভাবনা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তার ওপর।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নারীদের জন্য তিন লাখ ২৬ হাজার ৫৯ কোটি টাকার জেন্ডার বাজেট প্রস্তাব ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৪.৮ শতাংশ। তবে জেন্ডার বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। বিশেষত জেন্ডার বাজেটের আওতায় অন্তর্ভুক্ত ব্যয়গুলো কতটা প্রকৃত অর্থে জেন্ডার-সংবেদনশীল এবং নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আরও গবেষণা ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। ২০০৯-১০ সালে চারটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জেন্ডার বাজেটের সূচনার পর এই বাজেট এ পর্যন্ত কতটুকু নারীদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম হচ্ছে তা মূল্যায়ন করা দরকার। বিশেষ করে গ্রামীণ, দরিদ্র, প্রান্তিক, প্রতিবন্ধী ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের নারীদের ক্ষেত্রে।

নারীর কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এই বাজেট নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও কতটা সহায়ক হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাজেটে নারী উদ্যোক্তা ও নতুন স্টার্টআপের জন্য ৪০০ কোটি টাকার তহবিল এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা রয়েছে। তবে স্টার্টআপ তহবিল ও অন্যান্য প্রণোদনায় যুব নারীদের অংশীদারিত্ব কতটুকু, তা স্পষ্ট করা দরকার। 

নারী করদাতাদের জন্য কর সহায়তা এবং নারী নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সুযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগও ইতিবাচক। বাজেটে নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের টার্নওভারের ওপর করমুক্ত আয়ের সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারে বাজেটে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই সুবিধাগুলো নারী উদ্যোক্তাদের কাছে কতটুকু পৌঁছাবে?

আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, দেশের অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তা এখনও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। অনেকের ট্রেড লাইসেন্স নেই; ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত ও ডিজিটাল সক্ষমতাও সীমিত। ফলে শুধু কর ছাড় বা প্রণোদনার ঘোষণা দিলেই কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যাবে না। নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণ না হলে এই সুবিধাগুলো মূলত শহুরে ও তুলনামূলক প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বিশেষায়িত সহায়তা সেল গঠন করা যেতে পারে। 

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সেবা অর্থনীতি খাতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা। দেশে এখনও বিপুলসংখ্যক নারী পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে জীবন যাপন করছেন। বাজেটে জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব এবং বিভাগীয় ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা প্রতিরোধ, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে আরও জোরালো বিনিয়োগ প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, শিশুযত্ন সেবা ও গৃহস্থালি যত্নশ্রমের বোঝা কমানোর লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ এখনও পর্যাপ্ত নয়। অথচ নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই খাতগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাজেটে গ্রামীণ নারীর কর্মসংস্থান ও জীবিকা সুরক্ষার ক্ষেত্রেও আরও সুস্পষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা, সবুজ অর্থনীতি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য বিশেষ কর্মসূচি ও বিনিয়োগ থাকা উচিত। জলবায়ু পরিবর্তনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা যেন অর্থনৈতিক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি, যেখানে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কর্মরত। কিন্তু বাজেটে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, ডে-কেয়ার সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশিত ছিল। বিবিএসের ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে ২২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প খাতে অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের ফলে নারীরা তুলনামূলক বেশি কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই আপস্কিলিং ও রিস্কিলিং কার্যক্রমে বিনিয়োগ এখন সময়ের অন্যতম দাবি।

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি শুধু কর ছাড়, প্রণোদনা কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির বিষয় নয়। এর অর্থ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে নারীরা নিরাপদে কাজ করতে পারবেন, ন্যায্য মজুরি পাবেন, সহিংসতার শিকার হবেন না, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় থাকবেন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারবেন।

ফারাহ্ কবির: কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×