নাটোরের লালপুর
লাম্পি রোগে টিকা নেই সরকারি হাসপাতালে, ৩২ গরুর মৃত্যু
লালপুরের বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নওশারা সুলতানপুর চরে লাবু মিয়ার খামারে আক্রান্ত গরু। ছবি: সমকাল
মো. আশিকুর রহমান, লালপুর (নাটোর)
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:১৮
লাখ টাকা দামের গরুটি বিক্রি করে ঋণ শোধের পাশাপাশি একটি ভ্যান কেনার পরিকল্পনা ছিল দিনমজুর টিটু আলীর। লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) রোগে আক্রান্ত হয়ে গরুটি মারা যাওয়ায় সেই স্বপ্ন এখন মাটিচাপা পড়েছে। নিজের হাতে দাফন করার সময় চোখের জল লুকাতে পারেননি। সময়মতো সরকারি টিকা পেলে হয়তো এমন পরিণতি হতো না–আক্ষেপ করে বলছিলেন নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নাশোষা গ্রামের এই কৃষক।
টিটু আলীর মতো একই দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার শত শত ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষক। কোথাও গরু মারা যাচ্ছে, কোথাও আক্রান্ত পশুকে বাঁচাতে শেষ সম্বল বিক্রি করেও চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। অথচ সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় টিকা না থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গত মে মাসের শেষ দিকে পদ্মা বিলমাড়িয়া ইউনিয়নে প্রথম লাম্পি রোগের সংক্রমণ শুরু হয়। এক মাসের ব্যবধানে মহরাজপুর, নাশোষা, নওশারা, সুলতানপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে গরুর মৃত্যুর ঘটনা বাড়তে থাকে।
সমকালের অনুসন্ধানে অন্তত ২০টি গরুর মৃত্যুর তথ্য মিলেছে। তবে স্থানীয় পশুচিকিৎসক আল আমিনের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি। তাঁর হিসাবে গত এক মাসে শুধু বিলমাড়িয়া ইউনিয়নেই ৫০ থেকে ৬০টি গরু মারা গেছে এবং প্রায় তিন হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে।
মহরাজপুর গ্রামের নাসির আলীর বকনা বাছুরটিও একই রোগে মারা গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি বিক্রি করে বর্গা জমি নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। এখন গরুও নেই, টাকাও নেই। ভেঙে গেছে সেই স্বপ্নও।
টিটু আলী ও নাসির আলীর অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে বারবার গেলেও টিকা পাওয়া যায়নি। চিকিৎসা না পেয়ে গরু মারা গেছে।
লালপুরে প্রায় এক লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। গত এক মাসে মারা গেছে অন্তত ৩২টি গরু। আক্রান্তের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন, যেখানে প্রায় তিন হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই ধাপে সরকারি বরাদ্দ হিসেবে এসেছে মাত্র ৩৫০ ডোজ টিকা। নতুন সরবরাহ না থাকায় বর্তমানে টিকাদান কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
নয়ন আলীর একটি গরু ১৪ দিন ধরে আক্রান্ত। চিকিৎসায় পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। অবস্থার উন্নতি হয়নি। তিনি বলেন, সরকারি টিকা পাননি। বাজারে একটি টিকার দাম প্রায় দুই হাজার ২০০ টাকা, যা তাঁর মতো কৃষকের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।
প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। প্রথমে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজার, মৃত ১৫ থেকে ২০টি এবং টিকাযোগ্য গরুর সংখ্যা ৭৫ হাজার বলে জানানো হয়। পরে সাংবাদিকদের মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের পর সংশোধিত তথ্যে আক্রান্ত ২০ হাজার, মৃত ৩২টি এবং টিকাযোগ্য গরুর সংখ্যা এক লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি বলে জানায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জনবল সংকট থাকায় তথ্যে কিছু গরমিল হতে পারে। প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০ হাজার ডোজ টিকার চাহিদা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৩৫০ ডোজ। নতুন অর্থবছরের জন্য ৮৫ হাজার ডোজ টিকার চাহিদা পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখনও সরবরাহ আসেনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি ও প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রতিরোধের উপায় হলো আগাম টিকাদান, পরিচ্ছন্নতা এবং আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা। বর্ষাকালে মশা, মাছি ও রক্তচোষা পোকামাকড়ের মাধ্যমে রোগটি দ্রুত ছড়ায়। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এটি মহামারির রূপ নিতে পারে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, টিকার মজুত বর্তমানে নেই। তবে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহে নতুন টিকা পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- নাটোর
