জামায়াত থেকে বহিষ্কার গাজী নজরুলের এমপি পদ থাকবে কি
গাজী মো. নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ২২:২৮ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ২২:৩৩
জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী মো. নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ থাকবে কিনা এই প্রশ্ন উঠেছে। দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় অতীতে কারো এমপি পদ বাতিলের নজির নেই। তবে গণপ্রতিনিধি আদেশ-১৯৭২ এর ১২(খ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এমপি নির্বাচিত হতে বা পদে থাকতে পারবেন না, যদি তিনি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত না হন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী না হন।
২০০৮ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিধান যুক্ত করা হয়েছে গণপ্রতিনিধি আদেশে। তবে এই বিধান কার্যকরের পর ২০১২ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি এইচ এম গোলাম রেজাকে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার হলেও বিষয়টি নিষ্পত্তিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি না দেওয়ায় তার পদ বাতিল হয়নি।
তবে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদ বাতিলে এই আইনে ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনে গেলে, শুনানির আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। ফলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২(খ) অনুযায়ী, কোনো এমপি দল থেকে বহিষ্কার হলে পদ বাতিল হবে কিনা এ সংক্রান্ত নজির নেই।
২০১৪ সালে বহিষ্কৃত লতিফ সিদ্দিক এমপি পদ বাতিলে ওই বছরই স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। শুনানি করে নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার ডা. শিরীন শারমিন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ হাইকোর্টে যান লতিফ সিদ্দিকী। তবে হাইকোর্টের পর আপিল বিভাগও রিট খারিজ করেন।
২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট নির্বাচন কমিশনে শুনানি শুরু হয়। ওই শুনানিতে আওয়ামী লীগকে প্রতিনিধিত্ব করেন অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার। তিনি সমকালকে বলেন, দলের মনোনীত প্রার্থী বহিষ্কার হলে এমপি পদে থাকতে পারেন না। কারণ আইন অনুযায়ী এমপি দুইরকম- দলীয় এবং স্বতন্ত্র। দল বহিষ্কার করলেও সেই এমপি স্বতন্ত্র হয়ে যান না। ফলে দলে না থাকলে এমপি পদ থাকবে না।
রিয়াজুল কবীর সমকালকে জানান, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট প্রথম দিনের শুনানিতে লতিফ সিদ্দিকী সময় প্রার্থনা করেন। পরে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন। ফলে কোনো রায় বা আদেশ আসেনি।
সংবিধান কী বলে
দল কোনো এমপিকে বহিষ্কার করলে কী হবে তা সংবিধানে বলা নেই। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো এমপি যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে এমপি পদ বাতিল হবে। ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো এমপির নৈতিক স্খলনের কারণে দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য কারাদণ্ড হলে এমপি পদ বাতিল হবে। সাজার মেয়াদ শেষে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত এমপি হতে পারবেন না।
জামায়াত নৈতিক স্খলনের কারণ দেখিয়ে গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করেছে। তবে এ সিদ্ধান্ত কোনো আদালতের নয় বা গাজী নজরুলের জেল হয়নি। ফলে ৬৬ অনুচ্ছেদ তার জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেননি বা দলের বিরুদ্ধেও ভোট দেননি। ফলে এই অনুচ্ছেদেও প্রযোজ্য নয়।
আগের কী নজির
২০২১ সালে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হলেও দলের প্রাথমিক সদস্য পদ ছিল সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের। তার পদ বাতিলে স্পিকারকে চিঠি দেয়নি আওয়ামী লীগ। সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো এমপির আসন শূন্য হবে কিনা, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
সংসদ সদস্য আইন-১৯৮০ এর ৩ ধার অনুযায়ী, বিরোধ সৃষ্টির ৩০ দিনের মধ্যে স্পিকার বিরোধের বিবরণ প্রস্তুত করে শুনানির জন্য নির্বাচন কমিশনকে পাঠাবেন। জামায়াত নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
কীভাবে নির্বাচন কমিশন শুনানি করবে তা বলা রয়েছে আইনে। কমিশনকে এই আইনে দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এর রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
১৯৯৮ সালে বিএনপির দুই এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন এবং আলাউদ্দিন আহমদ নিজ দলে থেকে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। স্পিকার একে ফ্লোর ক্রসিং হিসেবে গণ্য না করলেও, আদালত একে দল ত্যাগ হিসেবে গণ্য করে ওই দুই এমপির পদ বাতিল করেন। বিএনপির এমপি আবু হেনা ২০০৪ সালে বহিষ্কার হয়েছিলেন। তৎকালীন স্পিকার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার তার পদ বহাল রাখেন। তবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের আগে এই ঘটনা ঘটেছিল।
জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বলেছেন, দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় এমপি পদ থাকবে না গাজী নজরুলের।