আক্ষেপ আছে, অনুশোচনা নেই—সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা না করার স্মৃতিতে ফেরদৌসী
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ২০:৫৯
বিশ্ববরেণ্য নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাতে অভিনয়ের সুযোগ—একজন অভিনয়শিল্পীর কাছে যা হতে পারে আজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই প্রস্তাব একসময় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন দেশের বরেণ্য অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। কারণ ছিল না অনীহা, ছিল সংসার, ছোট্ট সন্তানের দেখভাল এবং মঞ্চনাটকের প্রতি দায়বদ্ধতা। কয়েক দশক পর সেই সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করে তিনি বললেন, আক্ষেপ আছে, কিন্তু অনুশোচনা নেই।
শনিবার বিকেলে নাট্যদল অনুস্বরের সপ্তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘অনুস্বর সংলাপ’-এর চতুর্থ পর্বে নিজের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন ফেরদৌসী মজুমদার। প্রায় দুই ঘণ্টার এই আয়োজনে তিনি কথা বলেন অভিনয়, পরিবার, থিয়েটার এবং সহশিল্পীদের নিয়ে।
সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার প্রস্তাব প্রসঙ্গে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, সে সময় তার মেয়ে ত্রপা মজুমদার খুব ছোট ছিল। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের বেড়ে ওঠা এবং নিয়মিত মঞ্চনাটকের ব্যস্ততার কারণে তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারেননি। একই সময়ে বাংলাদেশের কালজয়ী চলচ্চিত্র সূর্য দীঘল বাড়িতে জয়তুন চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পরে ওই চরিত্রে অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারকে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, এখন কখনো কখনো মনে হয়, হয়তো সিনেমাগুলো করা যেত। তবে সেই সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে নিজের সিদ্ধান্তকে ভুল মনে হয় না। সংসার ও সন্তানের দায়িত্বের জায়গা থেকেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন।
আলোচনায় থিয়েটার নিয়ে নিজের দর্শনের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, নাটক শুধু হতাশার গল্প বলবে না, মানুষের জন্য আশার জায়গাও তৈরি করবে। একই সঙ্গে বর্তমান সময়ে শক্তিশালী নাট্যকারের অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, একটি ভালো নাটকের প্রাণ হলো সুগঠিত গল্প ও শক্তিশালী পাণ্ডুলিপি।
নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, থিয়েটারে আসা উচিত ভালোবাসা থেকে। শুধু তারকা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা খ্যাতির মোহ নিয়ে মঞ্চে দাঁড়ালে প্রকৃত শিল্পচর্চা হয় না।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে তিনি নিজের অভিনীত জনপ্রিয় নাটক কোকিলারা, মেরাজ ফকিরের মা এবং পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় থেকে সংলাপ আবৃত্তি করেন। দর্শকেরাও ফিরে যান বাংলা নাটকের স্বর্ণালি সময়ের স্মৃতিতে।
চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদীর সৌজন্য ও শ্রদ্ধাবোধের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, শুটিং সেটে তাকে দেখলেই হুমায়ূন ফরিদী উঠে দাঁড়াতেন এবং ইউনিটের সদস্যদের বলে রাখতেন, তিনি এলে যেন নিজের চেয়ারটি তাকে দেওয়া হয়।
সংসপ্তক নাটকে হুমায়ূন ফরিদীর সঙ্গে অভিনয় এবং বরফগলা নদী চলচ্চিত্রে সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে কাজের স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। সহশিল্পীদের প্রতি পারস্পরিক সম্মান ও আন্তরিকতাকেই শিল্পচর্চার অন্যতম সৌন্দর্য বলে মন্তব্য করেন।
নিজের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ হিসেবে কোকিলারা নাটকের নাম উল্লেখ করেন ফেরদৌসী মজুমদার। তার ভাষ্য, এই নাটকের জন্যই তাকে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছিল।
সৈয়দ শামসুল হক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আবদুল্লাহ আল-মামুনের মতো নাট্যকারদের পাণ্ডুলিপিতে অভিনয়ের সুযোগকে নিজের অভিনয়জীবনের বড় প্রাপ্তি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কেন এত বছর পরও মঞ্চের প্রতি তার টান অটুট—এমন প্রশ্নের উত্তরে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, মঞ্চই একমাত্র জায়গা, যেখানে শিল্পী দর্শকের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে অনুভব করতে পারেন। সেই প্রত্যক্ষ সংযোগই তাকে বারবার মঞ্চে ফিরিয়ে আনে।
আলোচনার একেবারে শেষে নিজের দীর্ঘ নাট্যজীবনের সারসংক্ষেপ টেনে তিনি বলেন, ‘থিয়েটার একটা সামগ্রিক ব্যাপার।’
- বিষয় :
- ফেরদৌসী মজুমদার
- সত্যজিৎ রায়
- সিনেমা