সাক্ষাৎকার: সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন
টিকা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি হাম নিয়ন্ত্রণকে জটিল করছে
সরদার সাখাওয়াত হোসেন
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০১ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
হামের জটিলতায় দেড় লাখের বেশি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এখন বরিশাল, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এর বাইরেও স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য সমস্যা আছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে। এসব বিষয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তবিবুর রহমান
সমকাল: হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণও বাড়ছে। স্বাস্থ্য খাতে কোনো দুর্বলতা আছে কি?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: দেশে হাম, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ বাড়লেও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা নেই। আমরা টিকা দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু অনেক মা তাদের সন্তানদের টিকা দেননি। আমি হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছি। যেসব শিশু হাসপাতালে আসছে, তাদের ৯৯ শতাংশই টিকাবিহীন। খুব কম শিশুই টিকা নিয়েছে।
যারা টিকা নিয়েছে, তাদের অবস্থাও অনেক সময় খারাপ, কারণ তারা যথাযথভাবে টিকা নেয়নি। আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে এরই মধ্যে ১০ লাখের বেশি শিশুকে নতুন করে টিকা দিয়েছি। টিকাদান কার্যক্রম চলমান আছে। তবে টিকা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি হাম নিয়ন্ত্রণকে জটিল করছে। আশা করি, টিকাদান শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সমকাল: দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাতে আপনাদের বড় অর্জন কী?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: ছয় মাসে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জরুরি পরিস্থিতিতে হামের টিকার মজুত নিশ্চিত করা এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা। আমরা টিকার সংকট কাটিয়ে পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তুলেছি। পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ কার্যক্রমও জোরদার করেছি।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। সেগুলোও আমরা নিয়েছি। দেশের ২৯৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫১ শয্যা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার, শিশুদের চিকিৎসার জন্য ২৫ শয্যার চাইল্ড কেয়ার সেন্টার এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও ১৫টি শয্যা থাকবে। এ জন্য ভবনের পরিসরও বাড়ানো হবে।
সমকাল: কর্মস্থলে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কী করেছেন? দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: এখন প্রায় ৯০ শতাংশ চিকিৎসক নিয়মিত কর্মস্থলে আসছেন। চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার আগে এই হার ছিল ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ।
সমকাল: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে আপনারা কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে প্রায় এক লাখ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর একটি বড় অংশ মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে। নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। এই মাসেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। আমরা চাই, স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের ঘরে ঘরে যাবেন। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং করবেন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্তন ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই পরীক্ষা করা হবে। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সার ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার সম্পর্কে নারীদের সচেতন করা হবে। কীভাবে নিজেরাই প্রাথমিকভাবে কিছু লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন, সে বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর পর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।
সমকাল: কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা নিশ্চিত করতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় চুক্তি করে দেশের ডায়ালাইসিস সেবাকে কার্যত জিম্মি করে ফেলেছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যানডোর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস। এই চুক্তি আমরা বাতিল করব। ঢাকার জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট (নিকডু) এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সরকারি ডায়ালাইসিস যন্ত্রগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রেখে একচ্ছত্রভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল এই বিদেশি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৩০টি এবং কিডনি ইনস্টিটিউটের ৬০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্র বসানো হয়। ডায়ালাইসিসের প্রতিটি সেশনের জন্য রোগীপ্রতি তিন হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হতো। আমরা সেই ব্যবস্থা পরিবর্তন করে নিজেরাই যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মানুষ দুই হাজার টাকার নিচে ডায়ালাইসিস করার সুযোগ পাবে। মোট এক হাজার ১২০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমকাল: দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছেন?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: সত্যি বলতে, আমি কোনো কাজে বড় ধরনের বাধা পাইনি। বরং আমার নেওয়া উদ্যোগগুলো প্রশংসিত হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিরোধিতা করার চেষ্টা করেছেন। মন্ত্রণালয়ের কিছু বিষয় নিয়ে বিভিন্ন চাপও এসেছে। কিন্তু আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
সমকাল: ক্যান্সার হাসপাতালের সম্প্রসারণের বিষয়ে কী পরিকল্পনা আছে?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: ক্যান্সার হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের শয্যা ও চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি শিশু হাসপাতালের দুটি ফ্লোর বাড়ানোর কাজ চলছে। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিসহ অন্যান্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সক্ষমতাও বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।
সমকাল: উপজেলাগুলোতে ডায়াবেটিস সেন্টার করার কোনো পরিকল্পনা আছে?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: উপজেলা পর্যায়ে ডায়াবেটিস সেন্টার করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। আমাদের যেসব ডায়াবেটিস সেন্টার রয়েছে, প্রয়োজনের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সেগুলোর কার্যক্রম বাড়ানো যেতে পারে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য যতদূর পর্যন্ত যাওয়া দরকার, আমরা ততদূর যাব।
সমকাল: সরকারি হাসপাতালে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও শয্যা সংকট এখনও দেখা যাচ্ছে। আপনাদের সরকারের ১৮০ দিন হতে চলেছে। এই সময়ে বাস্তব পরিবর্তন কতটা হয়েছে?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: আমরা ডাক্তারের সংখ্যা বাড়াতে পারিনি। তবে আমি অনেক হাসপাতালে ঘুরছি এবং ৯০ শতাংশ রোগী সন্তুষ্ট। আগের চেয়ে ভালো খাবার পাচ্ছেন, চিকিৎসকরা আসছেন এবং নার্স-চিকিৎসকরা ভালো ব্যবহার করছেন।
আমরা পাঁচ হাজার চিকিৎসক নতুন করে নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছি। আরও আড়াই হাজার টেকনিশিয়ান এবং আড়াই হাজার নার্স নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া ৯৩০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্র পরিচালনার জন্য জনবলের অনুমোদন পেয়েছি। আমরা অনেক দূর এগিয়েছি।
সমকাল: সারাদেশের পাঁচটি জেলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা গেছে, ক্যাথল্যাব, ডায়ালাইসিস যন্ত্র, আইসিইউ বেডসহ ভারী যন্ত্রপাতি রয়েছে, কিন্তু সেগুলো চালু নেই। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: ৯৫ শতাংশ যন্ত্র এখন অচল। কারণ, এগুলো প্যাকেটবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। জনবল নিশ্চিত না করে আগের সরকারের আমলে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এসব যন্ত্র কেনা হয়েছে এবং টাকা চুরি করা হয়েছে। এগুলোর ৯৫ শতাংশ এখন অবসোলিট (অচল) হয়ে গেছে। যেমন, খুলনা ও ফরিদপুরে দুটি এমআরআই মেশিন ১৮ কোটি টাকা করে কেনা হয়েছে। এমআরআই মেশিনের জন্য বাঙ্কার প্রয়োজন। কিন্তু ওই দুই হাসপাতালের একটিতেও বাঙ্কার নেই। এভাবেই টাকা মারার জন্য মেশিন আনা হয়েছে। একইভাবে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্র আনা হয়েছে, কিন্তু লোকবল নেই। মেশিন এনে ফেলে রাখা হয়েছে। ১০-১২ বছর পড়ে থাকতে থাকতে অনেক মেশিনে জং ধরেছে, সেগুলো অবসোলিট হয়ে গেছে। এর দায় আমরা নিতে পারি না।
সমকাল: সব উপজেলায় অ্যান্টিভেনম নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। এখন পরিস্থিতি কী?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: এখন প্রতিটি উপজেলায় অ্যান্টিভেনম পৌঁছে গেছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম চুরি হওয়ার অভিযোগ ছিল। এখন আমরা এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। একটি জায়গায় চুরির ঘটনা ধরা পড়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
সমকাল: যেসব যন্ত্র এখনও সচল আছে, সেগুলো চালুর জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: যেখানে যন্ত্র সচল আছে, সেখানে আমরা টেকনিশিয়ান নিয়োগ করছি। টেকনিশিয়ান নিয়োগ করে সচল যন্ত্রগুলো চালু করব। আর যেগুলো মেরামতযোগ্য, সেগুলো মেরামত করে চালু করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন: সমকালকেও ধন্যবাদ।
সম্পাদনা: আবুল হোসেন
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার