ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

প্রয়াণ দিবস

নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা দিন দিন জোরালো হচ্ছে

নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা দিন দিন জোরালো হচ্ছে
×

কাজী নজরুল ইসলাম

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের ৫০ বছর পূর্ণ হবে আগামীকাল ২৭ আগস্ট। অর্ধশতাব্দী পর তাঁকে স্মরণ করার তাৎপর্য তাই শুধু মৃত্যুবার্ষিকীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যায়, বৈষম্য ও মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি যে লেখনী ধারণ করে গেছেন, তার প্রাসঙ্গিকতা দিন দিন আরও জোরালো হয়েছে। 

১৯৪২ সালের জুলাই থেকে অসুস্থতা কাজী নজরুলকে ধীরে ধীরে বাক্‌শক্তি ও স্মৃতিহীনতার দিকে নিয়ে যায়। এরপর প্রায় ৩৪ বছর তিনি ছিলেন নীরব। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হসপিটাল) তাঁর জীবনাবসান হয়। 

১৮৯৯ সালের ২৪ মে বর্ধমানের চুরুলিয়ায় জন্ম নেওয়া ‘দুখু মিয়া’ শৈশবেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। মক্তব, মসজিদ, লেটোদল, রুটির দোকান– বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে তাঁর জীবনবোধ। লেটোদলের পালাগান ও নাট্যচর্চা তাঁকে দিয়েছিল ভাষা, সুর ও অভিনয়ের প্রাথমিক ভিত।

১৯১৭ সালের শেষ দিকে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে প্রায় আড়াই বছর সেনাজীবন কাটান কাজী নজরুল। করাচি সেনানিবাসে তাঁর সাহিত্যচর্চা গভীর হয়। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ তাঁর প্রথম গদ্যরচনা এবং ‘মুক্তি’ প্রথম প্রকাশিত কবিতা।

১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে কাজী নজরুল দ্রুত যুক্ত হন সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সঙ্গে। ‘নবযুগ’-এর পর ১৯২২ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘ধূমকেতু’। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থানের কারণে পত্রিকাটি সরকারের রোষানলে পড়ে। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের পর নজরুল গ্রেপ্তার হন এবং পরে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পান। তাঁর ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ প্রবন্ধ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য দলিল।

কারাগারেও কাজী নজরুল থেমে থাকেননি। রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে ১৯২৩ সালে দীর্ঘ ৪০ দিন অনশন করেছিলেন। পরে ‘লাঙল’-এর মাধ্যমে শ্রমিক-প্রজা ও সাম্যের প্রশ্নকে সামনে আনেন। ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত সেই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ‘সাম্যবাদী’ কবিতাগুচ্ছ ছিল কাজী নজরুলের সামাজিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

কাজী নজরুলকে শুধু বিদ্রোহের কবি বললে তাঁর ব্যাপ্তির পুরোটা আসে না। তিনি কবিতা, গান, সাংবাদিকতা, নাটক ও চলচ্চিত্র– প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রচলিত সীমানা ভেঙেছেন। উত্তর ভারতীয় রাগসংগীত, লোকসুর ও বাংলা গানের নানা ধারাকে মিলিয়ে তাঁর সংগীত বাংলা গানে নতুন আধুনিকতার পথ তৈরি করে।

নজরুলের দর্শনে স্বাধীনতা শুধু বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি নয়; মানুষের তৈরি সব শিকল থেকে মুক্তিও। সাম্য শুধু অর্থনৈতিক সমতা নয়; মানুষের মর্যাদার স্বীকৃতিও।
এই জায়গাতেই আজকের সময়ে কাজী নজরুল বারবার অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠেন। প্রযুক্তি বদলেছে, যোগাযোগ বেড়েছে, পৃথিবী ছোট হয়েছে; কিন্তু বৈষম্য, বঞ্চনা, অসহিষ্ণুতা ও ভয় শেষ হয়নি। ফলে কাজী নজরুল কোনো তৈরি উত্তর দেন না। দেন প্রশ্ন করার সাহস, অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে না করার সাহস, ভিন্নমতকে ভয় না পাওয়ার সাহস, মানুষের পরিচয়ের আগে মানুষকে দেখার সাহস।

১৯৭২ সালের ২৪ মে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন কাজী নজরুল ও তাঁর পরিবার। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট. দেয়; ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও একুশে পদক লাভ করেন। মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত হন।

আরও পড়ুন

×