রংপুরে চার খুন
‘দুইটা লোকের পক্ষে এই হত্যা সম্ভব নয়, বড় শক্তি আছে’
রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকায় সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদ। এখানে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাঁকে। পাশের বাসা থেকে খুব সহজেই এ ছাদে যাওয়া যায়। গতকাল মঙ্গলবার তোলা- সমকাল
লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল ও হাবিবুর রহমান সোনা, মিঠাপুকুর (রংপুর)
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কোনো শক্তি আছে বলে মনে করেন তাঁর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মহানগরীর কামাল কাছনার মাছুয়াপাড়ার সেই বাড়িতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে এ কথা বলেন গোপীনাথ।
শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে পরিবারের অন্য সদস্য ও শুভার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। স্বজন এ ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দাবি করেন। ভাইয়ের শোকে মুহ্যমান গোপীনাথ চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সন্দেহটা ওই জায়গায় যে, দুইটা লোকের পক্ষে এই হত্যাকাণ্ড করা সম্ভব নয়। দুইটা লোকে চারটে লোক মারবে এবং মারিয়ে তারা সুস্থভাবে থাকিয়া ঘুমাবে, বাড়িতে বসি থাকবে। এটা কখনোই সম্ভব নয়।’
হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত উল্লেখ করে গোপীনাথ বলেন, ‘একটা মানুষ খুন করা চাট্টিখানি কথা নয়। এর পিছনে কোনো বড় শক্তি আছে অলক্ষ্যে, আড়ালে।’
মামলার বাদী গোপীনাথ। মামলাটি এখন তদন্ত করছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পুলিশ ও এক আসামির একই রকমের জামা পরা, পেশাদার ছাড়া কারও পক্ষে চারজনকে হত্যার পর কি ওই বাসায় অবস্থান করে স্নান করা, খেজুর ও শসা খাওয়া সম্ভব– এসব প্রশ্নসহ নানা খুঁটিনাটি বিষয় খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে ডিবি। তবে চলমান তদন্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন গোপীনাথ।
তিনি বলেছেন, ‘লোকজন তো বলছে, বিদ্যুৎ আগে বন্ধ করে দিয়েছে। এখন কী যে হবে, যেটা হবে সেটা তো মেনে নিতে হবে। আমরা তো তদন্ত করার কেউ না। প্রশাসন একটার পর একটা যদি ব্যর্থ হয়ে যায়, তো করার কী আছে?’
কারও প্রতি সন্দেহ আছে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে গোপীনাথ বলেন, ‘না সেটা আমার নাই। কারণ, আমি তো কাউকে চিনি না। আমি তো দূরে থাকি। সংঘর্ষ বা কোনো ক্যাচালের কথাও শুনিনি। (গণপতি) খুব ভালো মানুষ ছিল। মানুষ এত ভালো হয় না।’
গণপতি, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীর মতো আর কাউকে যেন এভাবে নির্মম খুনের শিকার হতে না হয়, সেজন্য প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন আরেক নারী স্বজন। তিনি সজল চোখে বলেন, ‘ছোট্ট প্রিয়মকেও ওরা মেরে ফেলল। কলিটা ফুটতে দিল না। কী অপরাধ ছিল তার! কত বড় পাষণ্ড ওরা। আমরা কবুতরের একটা মাথা কাটতে গেলে হাত কাঁপে। ওদের বুক কাঁপল না! তবে, কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন শাস্তি না পায়।’
জিলা স্কুলে প্রার্থনা, স্মৃতিচারণ
এদিকে নিহতদের স্মরণে রংপুর জিলা স্কুলে প্রার্থনা ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ আয়োজন করেন।
স্মরণসভায় গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণ করেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। আয়ুশ এই বিদ্যালয়ের ছাত্র। এ সময় হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে ব্যথিত। তিনি একজন বিনয়ী মানুষ ছিলেন। তাঁর ছেলে আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল।’
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘গণপতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার কাছেই অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিলেন। আমরা চাই, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হোক। জেলা প্রশাসন, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই এ বিষয়ে কাজ করছে। আমরা দ্রুত বিচার চাই এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাই।’
গ্রামের বাড়িতে নীরবতা
গণপতি চক্রবর্তীর গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের শিব দেউলপাড়ার বাড়িতে সুনসান নীরবতা লক্ষ্য করা গেছে। বাড়ির সবাই তখন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানস্থল রংপুর নগরীতে অবস্থান করছিলেন। বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর মেয়ে স্বপ্না রানী বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, কাকা গণপতি ১০ বছর আগে একবার গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। মোবাইল ফোনে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হতো। তাঁর পারিবারিক সমস্যা নিয়ে কোনো সময় কিছু বলেননি। তাই, তাঁর পরিবার নিয়ে আমরা কিছু জানি না। বাড়িতে তাঁর সাত শতক জমি ছিল। তিনি সেটা বিক্রি করে দিয়েছেন।
‘পুলিশ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে’
গতকাল নগরীর নানা শ্রেণি-পেশার বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করেন, পুলিশ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। দুই তরুণের পক্ষে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার যে ব্যাখ্যা পুলিশ দিয়েছে, তা তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কোনো মানুষকে যখন হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়, তখন তিনি জীবন বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা করবেন। সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করার চেষ্টা চালাবেন। গণপতি একজন শক্ত-সমর্থ মানুষ। তাঁকে দুজন ছোকরা শ্বাসরোধে হত্যা করবে– এটা অবিশ্বাস্য।’
আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। কিন্তু তাদের শরীরে কোনো আঁচড়ের চিহ্ন আমরা দেখিনি। ধস্তাধস্তি হলে তারাও জখম হতো। আর শুধু ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে একের পর এক চারজনকে হত্যা করবে– এটা অগ্রহণযোগ্য ব্যাপার।’
জবানবন্দির তথ্যের খোঁজে
গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীকে হত্যায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার দুই তরুণ ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিয়েছেন। সমকালের পক্ষ থেকে তা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়।
১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থ জানিয়েছেন, হত্যার পর তারা বাড়ির বিভিন্ন ঘর ও ড্রয়ার তছনছ করেন। উদ্দেশ্য ছিল ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানো। এক পর্যায়ে মুগ্ধ একটি ঘরে ১৫ হাজার টাকা পান। বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকারও নিয়ে যান। পরে একটি নির্জন জায়গায় স্বর্ণালংকার লুকিয়ে রাখেন।
প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ তাঁর ব্যবহৃত টেকনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনটি মাদক ব্যবসায়ী প্রশান্ত ওরফে শান্ত ওরফে খুশির কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। এর পর দুই দফায় মোট ৯টি ইয়াবা বড়ি নেন তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি ইয়াবার দাম ছিল ৩৫০ টাকা। হত্যাকাণ্ডের পরদিন শনিবার আগের মাদকের টাকা পরিশোধ করা হয়। ডিবির একটি সূত্র জানায়, সিদ্ধার্থ তাঁর বাড়ির পাশের একটি মুদি দোকানে এক হাজার টাকার বেশ কয়েকটি নোট খুচরা করতে যান। গতকাল সেই দোকানদারের সঙ্গে কথা হয় সমকালের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দোকানদার বলেন, ‘সিদ্ধার্থকে আগে এ ধরনের চকচকে এক হাজার টাকার নোট নিয়ে দোকানে আসতে দেখেননি। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় পরে পুলিশকে জানাই।’
এদিকে পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার দুপুরের দিকে সিদ্ধার্থ কামাল কাছনা মায়াময়ী সড়কে স্থানীয় মুন ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিতে যান। তবে ক্লিনিকটির মালিক চিকিৎসক সমর্পিতা ঘোষ জানান, ওই দিন সিদ্ধার্থ তাঁর ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসেননি। তবে অভিযুক্ত তরুণকে তিনি আগে থেকেই চেনেন। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ওই এলাকায় গিয়েছিলেন।
ধর্ষণের আলামত বিষয়ে ডোমের দাবি
এক ডোম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মা ও মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এমন আলামত পেয়েছেন তিনি। চিকিৎসকের নির্দেশে তা সংরক্ষণ করেছেন। এ নিয়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। শরীরে ধস্তাধস্তির কারণে সামান্য আঘাত রয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য অন্য কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে দুজন ধর্ষণের শিকার হওয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
ডোমের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘ডোম যে ধরনের আলামতের কথা বলছেন, শ্বাসরোধে হত্যার শিকার নারীদের মধ্যে তা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।’
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের বিষয়ে পুলিশের তথ্যে গরমিল
এদিকে ঘটনার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে তদন্তকারী দল জানায়, অপরাধ সংঘটিত করার পর বাড়িটিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখতে বাহ্যিক লাইন মিটারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এই কাজ আসামি মুগ্ধ নিজে করেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে একজন ইলেকট্রিশিয়ান বলেন, লাইনে ত্রুটির কারণে ওই বাড়ির বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে তিনিই সংযোগ পুনঃস্থাপন করেন।
গ্রেপ্তার দুই তরুণের বাবা-মা যা বললেন
সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনোদ চন্দ্র দাস বলেন, সন্তান এমন ছিল না। মুগ্ধ তাকে খারাপ বানিয়েছে। সে নেশা করত ঠিক, তবে কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল না। কার পরামর্শে কী ভেবে এই জঘন্য ঘটনা ঘটাল, সেটিই মনে দাগ কাটছে।
মুগ্ধর মা সেনা রানী দাস জানান, বেশ কিছুদিন হলো টের পেয়েছেন ছেলে নেশা করে। তিনি বারবার নিষেধ করার পরও ছাড়াতে পারেননি। তবে নেশা করলেও খুনের মতো জঘন্য কাজের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত থাকতে পারে না তাঁর ছেলে। নেশার বাইরে অন্য কোনো খারাপ রিপোর্ট নেই ছেলের বিরুদ্ধে।