ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালের বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্যও বড় সতর্ক সংকেত

নেপালের বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্যও বড় সতর্ক সংকেত
×

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। বাংলাদেশ ও নেপালের ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা এক নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি, ভঙ্গুর প্রতিবেশব্যবস্থা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জনঘনত্ব এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাকৃতিক যে কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। 

বাংলাদেশ হিমালয় থেকে নেমে আসা বিশাল নদীব্যবস্থার নিম্ন অববাহিকায় এবং একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের প্রান্তে অবস্থিত। ফলে পাহাড়ে যা ঘটে, এর প্রভাব সব সময় পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। উজানের অতিবৃষ্টি, ভূমিধস, নদী অবরুদ্ধ হওয়া কিংবা আকস্মিক পানি ছাড়ার ঘটনা ভাটির দেশ বাংলাদেশের নদী, জনবসতি, কৃষি ও জীবিকার ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে বাংলাদেশের ঝুঁকি শুধু উজানের বন্যায় সীমাবদ্ধ নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম ক্রমেই ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে পড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ভূমিকম্পের শঙ্কা, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ঝুঁকি। আবার উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভূমি অবনমন নতুন ধরনের বিপদ তৈরি করছে।

ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের মধ্যে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে পারে, এমন শক্তি জমা হয়ে আছে। ফলে ওই অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, এমন ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হতে পারে কাপ্তাই হ্রদ ও সেখানকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ। ভূমিকম্পে বাঁধের কোনো দুর্বল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। বর্ষাকালে কাপ্তাই হ্রদে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এতে কাপ্তাই উপজেলাসহ আশপাশের এলাকায় বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।

জানতে চাইলে অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, ১৯৬২ সালে চালু হওয়া কাপ্তাই বাঁধের কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে কিনা, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। বাঁধের কোথাও ফাটল বা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে কিনা, পানির চাপ কতটা এবং কাঠামো সেই চাপ কতটা নিতে পারছে– এসব কিছুর নিয়মিত বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা প্রয়োজন। নেপালের ঘটনায় যে ধরনের আকস্মিক পানির প্রবাহ দেখা গেছে, বাংলাদেশেও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এমন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাহাড়, পানি, ভূমিকম্প ও বাঁধের দুর্বলতা– এসবকে আলাদা করে দেখলে চলবে না।

কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, নেপালের এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, দুর্যোগকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। হিমবাহ গলন, পাথরধস, ভূমিধস, নদী অবরুদ্ধ হওয়া, আকস্মিক বাঁধ ভেঙে যাওয়া, ফ্ল্যাশ ফ্লাড ও ভাটিতে পানি ছড়িয়ে পড়া– সবকিছু একই ধারাবাহিক বিপর্যয়ের অংশ হতে পারে।

তাঁর মতে, বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের দুর্যোগ পরিকল্পনাও শুধু দেশের সীমানার ভেতর সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। হিমালয়ের উচ্চভূমিতে কী ঘটছে, কোন নদীতে পানি বাড়ছে, কোথায় ভূমিধস হয়েছে বা কোথায় প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছে এসব তথ্য দ্রুত বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।

মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, জলবায়ু অভিযোজন মানে শুধু বাঁধ নির্মাণ বা ত্রাণ মজুত করা নয়। উচ্চভূমি থেকে ভাটির দেশ পর্যন্ত সমন্বিত আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। হিমালয় অঞ্চলে বড় প্রাকৃতিক পরিবর্তন হলে এর তথ্য দ্রুত বাংলাদেশের কাছে পৌঁছানো দরকার।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টারের পরিচালক সুজিত কুমার দত্তও মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় সীমারেখার মধ্যে আটকে রাখার সুযোগ নেই। নদীর উজানে কী ঘটছে, তা ভাটির মানুষকে দ্রুত জানানো না গেলে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা অর্থহীন হয়ে পড়ে। হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ভেঙে পড়া, পাহাড় ধসে নদী আটকে যাওয়া কিংবা আকস্মিক বরফ ও শিলা ধসের মতো ঘটনা ঘটলে এই তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো দরকার। এ জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি আঞ্চলিক রিয়েল-টাইম আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। 

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুশফিকুস সালেহীন বলেন, নেপালের বন্যায় বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক ক্ষতির শঙ্কা নেই। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিয়মিত নদীর পানির স্তরের তথ্য রাখা প্রয়োজন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ভাটিতে থাকায় বন্যা না হলেও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকে। নদী ও খালের স্বাভাবিক গতিপথ আটকে নগর ও শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে মানুষ নিজেরাই ঝুঁকি বাড়িয়েছে। অববাহিকার দেশ হিসেবে নদী ও প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা উচিত। বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে পরিবেশবিদ, ভূতত্ত্ববিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী জিওমেট্রিক্স, ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস অ্যান্ড রিস্কে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল দেশের কেন্দ্র ও পশ্চিম উপকূলের তুলনায় দ্রুত হারে নিচে নেমে যাচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম উপকূলীয় সমভূমিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে ৪ দশমিক ৭৩ মিলিমিটার বাড়ছে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। পশ্চিমের সুন্দরবন জোয়ার-ভাটা সমভূমিতে এ হার ৩ দশমিক ৬৬ মিলিমিটার এবং কেন্দ্রীয় মেঘনা মোহনা সমভূমিতে ২ দশমিক ৪ মিলিমিটার। দেশের উপকূলে গড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে ৪ দশমিক ৫৮ মিলিমিটার বাড়ছে। বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৭ মিলিমিটার।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিশেষ করে পূর্ব উপকূলে জোয়ার-ভাটার ব্যবধান বাড়ছে। এতে বাড়ছে বন্যা, নদীভাঙনের ঝুঁকিও। বাংলাদেশের উপকূলীয় অনেক এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ থেকে ১ দশমিক ৫ মিটার উঁচুতে। ফলে সামান্য উচ্চতা বৃদ্ধিও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গবেষণাটির প্রধান ও অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশরাফ দেওয়ান বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সমতলভূমিতে দ্রুত নগরায়ণ এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পের গভীর পাইলিং ভূমিধসে অবদান রাখছে। এ অঞ্চলে জোয়ার-ভাটার তীব্রতাও বেশি।

অন্যদিকে সুন্দরবন পশ্চিমাঞ্চলে প্রাকৃতিক বাফার হিসেবে কাজ করছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, পূর্বাঞ্চলে ভূমি তুলনামূলক সমতল ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের অনেক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কৃষিজমি ডুবে যেতে পারে এবং লাখো মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন

×