ঢাকা সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসে সর্বোচ্চ, লিটারে বৃদ্ধি ২০ টাকা

জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসে সর্বোচ্চ, লিটারে বৃদ্ধি ২০ টাকা
×

ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন– চার ধরনের তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে

হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৩:০৬ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৩:৪৮

আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন– চার ধরনের তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আজ সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার হলো। এটা দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রোল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে। 

জ্বালানির এই মূল্য বৃদ্ধিতে পরিবহন, কৃষি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি এর চাপ নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এখনও অব্যাহত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে দেশে পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে তেলের দাম বেড়েছে ১৪২%
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৪৪ থেকে বেড়ে ১০৬ টাকা ৭৫ পয়সা হয়। অর্থাৎ দাম বাড়ে ১৪২ শতাংশ। পেট্রোল ও অকটেনের দাম যথাক্রমে ৭৪ ও ৭৭ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ ও ১২৭ টাকা হয়; বৃদ্ধি প্রায় ৬৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপের যুক্তিতে কয়েক দফা দাম বাড়ানো হয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২২ সালের ৫ আগস্ট। ওই রাতে চার ধরনের জ্বালানির দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। অকটেনের দাম ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পেট্রোলের দাম ৫১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছিল। এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে ডিজেলের দাম এক লাফে ১৫ টাকা বাড়ে। ২০২৪ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মাসিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হয়। 

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দফায় দফায় কমেছে-বেড়েছে দাম
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিলিয়ে কয়েক দফা দাম সমন্বয় করা হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে অকটেন ও পেট্রোলের দাম ৬ টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১ টাকা ২৫ পয়সা কমে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার ধরনের তেলের দাম ১ টাকা করে বাড়লেও জুনে ডিজেল ২ টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেন ৩ টাকা করে কমে। ডিসেম্বরে আবার চার ধরনের তেলের দাম ২ টাকা করে বাড়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আরও দুই দফায় লিটারপ্রতি ২ টাকা করে কমানো হয়। ফেব্রুয়ারির সর্বশেষ সমন্বয়ের পর ডিজেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২, পেট্রোল ১১৬ এবং অকটেন ১২০ টাকা। 

বিএনপি সরকারের সময়ে দাম বাড়ল ৩৫-৪৫ টাকা
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১০০, ১১২, ১১৬ ও ১২০ টাকা।  এই দাম ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যকর হয়েছিল। মার্চ ও এপ্রিলের শুরুতে এই দামই বহাল ছিল।  এপ্রিলের মাঝামাঝি হুট করে বড় ধরনের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বাড়তে থাকায় ১৮ এপ্রিল রাতে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। ওই সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মার্চের শেষ দিকে প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এতে দাম দাঁড়ায় যথাক্রমে ১১৫, ১৩০, ১৩৫ ও ১৪০ টাকা। গত জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়। ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। জুনের নতুন দামই জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে শুরুতে বহাল ছিল। গতকাল আবার এক লাফে চার ধরনের তেলের দাম ২০ টাকা করে বাড়ল।

এই দাম কার্যকর হলে গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় ডিজেলের দাম ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩, পেট্রোল ৪৪ এবং অকটেন ৪৫ টাকা বাড়বে। অর্থাৎ বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত মাসে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

লোকসানের কারণে দাম বৃদ্ধি– দাবি বিপিসির
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দাবি, ২০২৫ সালের এপ্রিলের চার হাজার ১৯৫ কোটি টাকার আমদানি ব্যয় চলতি বছরের এপ্রিলে বেড়ে আট হাজার ১৩৫ কোটি টাকা হয়। মে মাসের খরচ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চার হাজার ১৮২ কোটি থেকে বেড়ে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি এবং আগস্টে দুই হাজার ৭৪০ কোটি ৬২ লাখ থেকে সাত হাজার ৬০৩ কোটি টাকা হয়েছে। 

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির নিজস্ব তহবিলের লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে এপ্রিলে লোকসান সাত হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ছয় হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে লোকসান পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 

বিপিসি জানিয়েছে, তারা আমদানি ব্যয় মেটাতে চলতি বছর ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলেছে। বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেয় বিপিসি। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত লোকসানের অর্থ সরকারি সহায়তা হিসেবে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক-কর কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। 

এরপর বিপিসির অর্থ সংকট নিয়ে গত সপ্তাহে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয়। সূত্র জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে বিপিসিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। 

রোববারের প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাচারের ঝুঁকি
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কলকাতায় ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।

বাড়বে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়
নতুন দাম কার্যকর হলে পরিবহন খাতে সরাসরি প্রভাব পড়বে। ডিজেলচালিত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লঞ্চের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ায় কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য এক স্থান থেকে অন্যত্র নিতে বাড়তি ব্যয় হবে। 

কৃষিতেও ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে সেচ পাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, ধান মাড়াইসহ বিভিন্ন কাজে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ পরিবহনের খরচ বাড়ার প্রভাবও পড়তে পারে বাজারে।

শিল্প খাতেও জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। ডিজেলচালিত জেনারেটর, পণ্য পরিবহন ও উৎপাদনের বিভিন্ন কাজে বাড়তি খরচ হবে। গ্যাসের সংকটে যেসব শিল্প বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানি ব্যবহার করে, তাদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের ব্যয়ও বাড়বে। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের নতুন দাম পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। 

আরও পড়ুন

×